১২৫ তম জন্মবর্ষে বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু


১২৫ তম জন্মবর্ষে বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু

ভূমিকা :

বােস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের প্রবর্তক বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১লা জানুয়ারি, ১৮৯৪) ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। এই বিজ্ঞানসাধক শুধু বাঙালির গর্ব নয়, সারা ভারতের গর্ব।

বিজ্ঞানের নব নব দিগন্ত উন্মােচিত হচ্ছে, দেশ আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাখায় ভর করে একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে যাচ্ছে, তবুও আমরা এই শ্রেষ্ঠ বাঙালি বিজ্ঞানীকে ভুলতে পারিনি, পারবও না।

বর্তমানে তার জন্মের ১২৫তম বর্ষে তাকে শ্রদ্ধা জনানাের নানা আয়ােজন চলছে, তার ভাবনাকে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা চলছে।

জীবনী :

পরাধীন ভারতের বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব, বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্ম কলকাতায়। অসাধারণ মেধাশক্তির অধিকারী; সংগীতে, দর্শনে এবং সাহিত্যের একনিষ্ঠ অনুরাগী বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন পূর্ণতার সাধক।

হিন্দু স্কুলে পড়ার সময় তিনি এক বাৎসরিক পরীক্ষায় ১০০-র মধ্যে পেয়েছিলেন ১১০। গণিতে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি দেখে তৎকালীন প্রবাদপ্রতিম গণিত শিক্ষক উপেন্দ্রনাথ বক্সী বলেছিলেন, “সত্যেন একদিন ক্যাশি বা ল্যাপ্লাসের মতাে গণিতবিদ হবে।

বােস পরিসংখ্যানের সাহায্যে প্লাঙ্কের কোয়ান্টাম মতবাদের ওপর নতুনভাবে আলােকপাত করে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষকের ভবিষ্যদ্বাণী সফল করেছিলেন। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন (৫ম স্থান)।

তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র হলেন, শিক্ষক হিসেবে পেলেন জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়-কে। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে আই.এস.সি.তে প্রথম হলেন। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে গণিত সাম্মানিক সহ স্নাতক হলেন এবং প্রথম স্থান পেলেন।

মেঘনাদ সাহা তার সতীর্থ ছিলেন, তিনি হলেন দ্বিতীয়। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে মিশ্র গণিতে এম.এস.সি-তে প্রথম হলেন। এতেও মেঘনাদ হলেন দ্বিতীয়। তার এই পরীক্ষায় পাওয়া নম্বরের রেকর্ড এখনাে কেউ ভাঙতে পারেনি।

কর্মজীবন :

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে স্যার আশুতােষের আমন্ত্রণে বিজ্ঞান কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান ও মিশ্র গণিতের ‘লোরার হিসেবে যােগ দেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি রীডার পদে যােগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র –‘প্লাঙ্কের সূত্র এবং সালােক কোয়ান্টাম প্রকল্প।

প্রবন্ধটির মৌলিকত্বে আইনস্টাইন মুগ্ধ ও বিস্মিত হন। আইনস্টাইন মনে করেছিলেন, এই প্রবন্ধ পদার্থ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।

শুধু তাই নয়, আইনস্টাইন নিজে এই প্রবন্ধটির অনুবাদ করে জার্মান পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এরই ফলশ্রুতি হল—‘বােস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান।

সন্মান :

১৯২৪-২৫ খ্রিস্টাব্দে তার ইউরােপ যাত্রা ও আইনস্টাইনের সান্নিধ্য লাভ। এছাড়া জার্মানি ও ফ্রান্সের বহু বিজ্ঞানীর সঙ্গে মত বিনিময় হয়। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে তিনি পদার্থ বিজ্ঞান শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে খয়রা অধ্যাপক পদে যােগ দেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ‘পদ্মবিভূষণ’ উপাধি লাভ এবং ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে যথাক্রমে কলিকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট উপাধি লাভ।

১৯৫৯ থেকে আমৃত্যু (১৯৭৪) তিনি জাতীয় অধ্যাপক রূপে স্বীকৃতি পান। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি প্রদান করেন। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিনের জন্য উপাচার্য নিযুক্ত হন

তিনি।

উপসংহার :

শুধু বিজ্ঞানী হিসেবে নয়, তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ। বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সংগীত ও সাহিত্য চর্চাতেও তিনি সময় ব্যয় করতেন। মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা স্মরণযােগ্য।

এজন্য তিনি বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়েছিলেন। এখান থেকে ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশ করে বিজ্ঞান বিষয়কে জনমানসে প্রচার করেন। তাঁর ‘বিজ্ঞানের সংকট’ গ্রন্থটি এক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখ্য।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থখানি সত্যেন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন বড়াে মাপের মানুষ। তিনি ছিলেন এক হৃদয়বান, নিরহংকারী, ঋষিতুল্য মানুষ, ছাত্রবৎসলও ছিলেন। সারল্য ও মমত্ববােধ ছিল তার সহজাত।

আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রথম ও প্রধান পরিচয় বিজ্ঞানী হলেও মাতৃভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর যা অবদান তা বাঙালি চিরকাল মনে রাখবে, মনে রাখবে বিজ্ঞান চেতনাকে সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার উদ্যোগ-কে।

 অনুসরণে লেখা যায় ঃ বিজ্ঞানসাধক সত্যেন্দ্রনাথ বসু।



error: Content is protected !!