লকডাউন রচনা | লকডাউন ও বেকার সমস্যা

লকডাউন ও বেকার সমস্যা

ভূমিকা :

করােনা ভাইরাসের আগমন, মানুষের স্বাস্থ্যের সুরক্ষার কথা ভেবে দীর্ঘ লকডাউন, পরিযায়ী শ্রমিকের সমস্যা, বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মী ছাঁটাই, সরকারি ক্ষেত্রকে বেসরকারিকরণ, বাড়িতে বসে থেকে মানুষের কর্মশক্তি বিনষ্ট হওয়া, কাজের সুযােগ চলে যাওয়া প্রভৃতি ঘটনা ভারতীয় অর্থনীতির দৈন্যদশাকে আরাে প্রকট করে তুলেছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণ ও কর্মীদের স্বেচ্ছাবসর-এর অবকাশে সৃষ্টি হয়েছিল বেকার সমস্যা, বর্তমানে তার সঙ্গে যুক্ত হল স্বাস্থ্যের কারণে লকডাউন। এর ফলে কাজ হারানাে মানুষের তীব্র হাহাকার ও এক অনিশ্চয়তাজনিত সংকট—যে সংকট থেকে মুক্তির সম্ভাবনা কেবলমাত্র ভবিষ্যতের হাতে।

লকডাউন কী :

লকডাউন বা অবরুদ্ধকরণ বলতে বােঝায় এক ধরনের জরুরি অবস্থাকালীন ব্যবস্থাবিধি —যাতে কোনও আসন্ন বিপদের ভয়াবহতার প্রেক্ষিতে সাময়িকভাবে কোনও নির্দিষ্ট এলাকা বা বাড়ি থেকে মানুষের বের হওয়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা আরােপ। এ বছর লকডাউন হয়েছে করােনার ভয়াবহতার কারণে।

সাধারণত লকডাউনের সময় নিত্যপ্রয়ােজনীয় দ্রব্যের দোকান, মুদির দোকান, ঔষধের দোকান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যাংক এ টি এম, টেলিভিশন, বেতার, টেলিযােগাযোেগ, ইন্টারনেট, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিষেবা চালু থাকে। অন্যদিকে লকডাউন-এর সম্পূর্ণ সময় ধরে প্রায় অন্য সমস্ত কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকে।

সরকারি কাজ বাড়িতে বসে করা যায়। যারা দিনমজুরি করেন বা অস্থায়ী কাজ করেন তাদের জন্য সরকার বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করতে পারে। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থান, প্রেক্ষাগৃহ, বিবাহের অনুষ্ঠান, কেনাকাটার দোকান বা শপিং মল, জিম, মিউজিয়াম প্রভৃতি বন্ধ থাকে।

কখনাে কখনাে চরম পর্যায়ে ১৪৪ নং ধারা জারি করা হতে পারে, যাতে যে কোনও ধরনের জনসমাগম আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়। যদি কেউ লকডাউন বা অবরুদ্ধকরণের বিধিনিষেধ অমান্য করে, তাহলে সেই অন্যায়কারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেবার সুযােগ থাকে।

মহামারী ও লকডাউন :

২৪ মার্চ, ২০২০ প্রধানমন্ত্রী ভারতে সরকারিভাবে একুশ দিনের (২৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল) লকডাউন ঘােষণা করেন—মহামারীর ক্ষেত্রে সাবধানতা গ্রহণ করার জন্য—যখন করােনা আক্রান্ত রােগীর সংখ্যা ছিল ৫০০। এরপর দ্বিতীয় লকডাউন পর্ব ১৯ দিনের (১৫ এপ্রিল থেকে ৩রা মে), তৃতীয় পর্বের লকডাউন পর্ব ১৪ দিন (৪ মে থেকে ১৭ মে), চতুর্থ পর্বের লকডাউন ১৮মে থেকে ৩০শে জুলাই পর্যন্ত চালু হয়।

মােট চার মাস নয় দিন ভারতে লকডাউন জারি ছিল। চিনের উহান থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী যখন কেরালা রাজ্যে ফিরে এসেছিল ৩০শে জানুয়ারি, তখনই ভারতের প্রথম করােনা আক্রান্তের সন্ধান মেলে। তখনই লকডাউন শুরু করলে, ট্রেন ও বিমান বন্ধ করলে ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা হয়তাে বাড়ত না কিম্বা লকডাউন এতদিন করে যে ক্ষতি হল অর্থনীতির, তাও বন্ধ করা সম্ভব হত।

প্রভাব :

(১) আনুমানিক ১ কোটি ৩৯ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ভারতের বিভিন্ন শহরে ও প্রান্তরে কাজ করে। লকডাউনের জেরে কারখানা ও কর্মক্ষেত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা নেমে আসে। আবার যারা ভাড়াবাড়িতে থাকে কাজ হারিয়ে বাড়ি ভাড়া না দিতে পেরে তারাও বিতাড়িত হয়। ফলে আশ্রয় ও অন্নের সংস্থান হারিয়ে তারা বাসস্ট্যান্ড, স্টেশনে ভিড় করে বাড়ি ফেরার জন্য।

(২) খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও লকডাউনের ফলে ভেঙে পড়ে, পণ্য পরিবহনের অভাবে। ফলে সৃষ্টি হয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের দুর্বিষহ যন্ত্রণা। এমনকি ফ্লিপকার্ট অ্যামাজন অস্থায়ীভাবে তাদের পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। শ্রমিকের অভাবে উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্যসংকট সৃষ্টি হয়। মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষ আতঙ্কে নিত্যপ্রয়ােজনীয় জিনিষ মজুত করার জন্য সচেষ্ট হওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়।

(৩) হঠাৎ লকডাউন ঘােষণা করায় ও কোনাে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা না থাকায় ও বারবার লকডাউন-এর সময়সীমা বাড়ানাের ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে বেসরকারি ক্ষেত্রের লােকেরা ও দৈনিক ঠিকাভিত্তিক শ্রমিকরা চরম দুর্দশায় পতিত হয়।

(৪) কিছুদিন লকডাউন করার পর শ্রমিকরা ভবঘুরেদের মতাে অনিশ্চিতের পথে ছুটতে ছুটতে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে, পরে তারা বিভিন্ন রাজ্য থেকে নিজেদের পুরােনাে আশ্রয়ে ফিরে আসে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আসে করােনা রােগের বীজ নিয়ে যাদের দ্বারা করােনা রােগ আরাে সংক্রমিত হয়।

(৫) ভারত সরকারের দূরদর্শিতার অভাব, রােগ সম্বন্ধে কোনাে আগাম অনুমান করতে না পেরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রকে তলানিতে নিয়ে যেতে অনুঘটকের ভূমিকা গ্রহণ করে।

বেকার সমস্যা :

ভারতে এপ্রিল মাসে যেখানে বেকারত্ব ছিল ২৩.৫২ শতাংশ, সেখানে ১৪ অক্টোবর সেই হার হয়েছে ৬.৮১ শতাংশে। জিডিপিও বিগত এগার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং তা ভুটান, বাংলাদেশ এর থেকেও নীচে। এর কারণ পর্যটন, হােটেল, পরিবহন প্রভৃতি ক্ষেত্রে যুক্ত মানুষদের কাজ না থাকা এবং করােনা মহামারীর আতঙ্কে থাকা।

কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সরকারি ক্ষেত্রকে বেসরকারিকরণ-এর জন্য কর্মী ছাঁটাইর সমস্যা তাে ছিল, সেইসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যেসব অস্থায়ী, পরিযায়ী শ্রমিকরা ছিল, তাদের সম্বন্ধে নির্দিষ্ট কোনাে তথ্য সরকারের কাছে না থাকায় বেকার সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে।

তাছাড়া কৃষিক্ষেত্রে যেভাবে যন্ত্রের আমদানি হয়েছে সেখানেও আর কায়িক শ্রমের চাহিদা না থাকায়, বিকল্প কাজের সুযােগ না থাকায় পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছে বেকারত্বের স্বরূপকে তা দীর্ঘস্থায়ী করে দেয়।

অবশ্য সরকার বিভিন্ন গ্রামীণ প্রকল্পে শ্রমদিবস সৃষ্টি করে শ্রমিকদের কাজে লাগালেও তাতে বেকার সমস্যার সুরাহা খুব একটা হওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্দশা বাড়তে থাকে। এর পরােক্ষ ফল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উপর প্রতিফলিত হয়। মানুষ তাদের জমানাে পুঁজি ভাঙিয়ে কোনরকমে দিন গুজরানে সচেষ্ট হয়।

উপসংহার :

শহরাঞ্চলে সকালের ট্রেনে যে প্রচুর পরিমাণ কাজের মেয়ে ও শ্রমিকরা নিত্যদিন শহরের বাড়ি বা কারখানার কাজে আসত তারাও কাজ হারায় লকডাউনের জন্য লােকাল ট্রেন বন্ধ থাকার ফলে। তাদের কেউ কেউ ভিন্ন পেশা অবলম্বন করলেও বেশির ভাগ শ্রমিকই কাজ হারিয়ে অর্ধভুক্ত অবস্থায় ও চিন্তা ভাবনার মধ্যে দিন গুজরান করছে।

তাই লকডাউন বেসরকারি ক্ষেত্রে ও বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত শ্রমিক, দিনমজুর, কাজের মেয়ে প্রভৃতিদের ঠেলে দেয় অনিশ্চয়তার দিকে। এই অনিশ্চয়তা থেকে সৃষ্টি হয় অবসাদ ও অনিকেত মনােভাব—যা যে কোনাে সমাজের কাছে মােটেই সুখকর নয়।


RECENT POST

LATEST POST