স্মরণে মননে ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি (প্রবন্ধ রচনা)


স্মরণে মননে ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি

ভূমিকা:

অনন্যসাধারণ রাজনীতিবিদ ও দক্ষ প্রশাসক এবং ভারতের ত্রয়ােদশ রাষ্ট্রপতি ও প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি তথা রাজনীতির চানক্য বিদায় নিলেন ২০২০-র আগস্টের শেষ দিনে, সেই সঙ্গে সমাপ্ত হল তার দীর্ঘ ছয় দশকের নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক কর্মজীবন ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস হারাল এক প্রবীণ নেতাকে।

বাঙালির গর্ব, রাজনীতির চাণক্য চলে গেলেন, বাঙালিও হারালাে তার হাতে গােনা আইকনদের মধ্যে একজনকে। বীরভূমের কীর্ণাহার-এর মতাে অজপাড়াগাঁ থেকে রাইসিনা হিলসের অন্দরমহলে পৌঁছে যাওয়া পর্যন্ত প্রণব মুখার্জীর স্বপ্নের উড়ান আধুনিক বাঙালির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্মরণীয় হয়ে থাকবে তার ধৈর্য, সাহস, দৃঢ়চিত্ততা, সততা তথা বৃহৎ কর্মকাণ্ডের বিশিষ্ট অধ্যায়গুলি—যা আগামীদিনে বাঙালিকে পথ দেখাতে পারে।

জন্ম ও শিক্ষা:

বীরভূম জেলার কীর্ণাহার শহরের নিকটে মিরাটি-র ব্রাত্মণ পরিবারে কামদাকিঙ্কর মুখােপাধ্যায় ও রাজলক্ষ্মী দেবীর সন্তান প্রণব মুখােপাধ্যায় ১১ ডিসেম্বর, ১৯৩৫-এ জন্ম- গ্রহণ করেন। কীর্ণাহারের শিবচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পড়া শেষ করে সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তার মায়ের আদরের ‘পন্টু’।

মাঠের আলবাঁধা পথে যাতায়াত করে পড়াশােনা করেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম. এ. এবং এল, এল. বি. ডিগ্রি লাভ করেন। তার বাবা গান্ধীজির আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৭ সালে অধুনা বাংলাদেশের নাড়াইল-এর শুভ্রা মুখখাপাধ্যায়-কে তিনি বিবাহ করেন। ১৯৬৬-তে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।

রাজনৈতিক মতাদর্শ :

প্রণব মুখার্জী রাজনীতিতে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং বিরােধী রাজনীতিকদের কথা শুনতেন ও তাদের গুরুত্ব দিতেন। রাজনীতি যে জনগণের জন্য এবং রাজনীতিতে যে শেষকথা কিছু হয় না, তা তিনি বিশ্বাস করতেন বলেই রাজনৈতিক সংকট মােচনে তিনি পরিত্রাতা রুপে অনেক সময় অবতীর্ণ হয়েছেন। ১৯৬৬-তে তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেন। সংসদে শেষ বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, শেষ পঞ্চাশ বছর ধরে আমার পবিত্র গ্রন্থটি ছিল ভারতের সংবিধান, মন্দির ছিল সংসদ এবং দেশবাসীর সেবা ছিল আমার আবেগ। তিনি সাধারণ মানুষকে বােঝাতে চাইতেন যে, ভারতবর্ষ উন্নতির শিখরে উঠছে এবং মানুষকে তার সঙ্গী হতে হবে।

রাজনৈতিক জীবন:

১৯৬৯-এ ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে প্রণব মুখার্জী যুক্ত হন এবং শুরু হয় তার রাজনৈতিক পদচারণার প্রথম অধ্যায়, ইন্দিরা গান্ধী তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় পেয়ে ১৯৬৯-এ রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে তাকে মনােনয়ন দেন। এরপর ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯৩, ১৯৯৯-তে রাজ্যসভার সদস্য হন।

জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধীর তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত সৈনিক। ১৯৭৮-এ শ্রীমতী গান্ধী তাকে ডেপুটি লিডার ও ১৯৮০-তে লিডার পদে রাজ্যসভায় মনােনীত করেছিলেন। ইন্দিরার মৃত্যুর পর তিনি রাজীব গান্ধীর ততটা প্রিয় না হলেও রাজীবের মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক জীবনের পুনরুত্থান ঘটে।

১৯৯১-তে নরসিমা রাও তাকে প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান পদে অভিষিক্ত করেন। প্রণব মুখার্জী গান্ধী পরিবারের বিশ্বস্ত ছিলেন এবং রাজনীতিতে সনিয়া গান্ধীর আগমনের বিশ্বস্ত কারিগর ছিলেন তিনি। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বৈদেশিক কুটনীতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে প্রশাসনিক পরিসর যে সমস্যাই দেখা দিক না কেন, নির্ভুল ক্রাইসিস ম্যানেজার ছিলেন প্রণব মুখার্জী।

২০০৪-এ রাষ্ট্রীয় জনতা দলের লালুপ্রসাদ যাদব, অথবা কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এনসিপি তৈরি করা শারদ পাওয়ার-এর মতাে শক্তিকে কংগ্রেসের ছাতার তলায় এনে মনমােহন সিং-এর নেতৃত্বে কেন্দ্রে ইউপিএ সরকার গঠন তার কৃতিত্ব। আবার মনমােহনের নেতৃত্বে তিনি যখন বিদেশ মন্ত্রকের দায়িত্বে, তখনই ভারত-মার্কিন অসামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

সেই চুক্তির প্রতিবাদে ইউপিএ সরকার থেকে বামেরা বেরিয়ে এলেও প্রণব মুখার্জীর ক্ষুরধার বুদ্ধিতে ইউপিএ সরকার সে যাত্রায় টিকে যায়। তিনি যখন ভারতরত্ন’ হলেন, তখন কেন্দ্রে বিপরীত রাজনৈতিক মেরুর সরকার। বােঝা যায়, রাজনীতিতে বিরােধিতা থাকলেও তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের গ্রহণযােগ্যতা কোনও দলীয় বৃত্তে সীমাবদ্ধ ছিল না।

রাজনীতিতে সমন্বয়ী অথচ নিজস্ব সিদ্ধান্তে অবিচল থেকে মনে প্রাণে বাঙালি হয়ে আর কর্মে সর্বভারতীয় হয়ে কীর্ণাহারের বাড়ির পূজা থেকে সংসদে শ্রীশ্রীচণ্ডীর মন্ত্রপাঠ সবই তার উদারমন ও পরিণত বুদ্ধির পরিচায়ক। এই ধরনের সমন্বয়ী ভাবনা ও সৌজন্য বর্তমান রাজনীতিতে আজ একান্তই বিরল।

মন্ত্রী ও কৃতিত্ব:

২০০৪-এ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রতিরক্ষা দপ্তরে বিশেষ করে নৌবাহিনীতে উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন আনেন এবং ২০০৫-এ ১০ বছরের যৌথ মহড়ার (আমেরিকা, রাশিয়া ও ভারত) কর্মসূচী গ্রহণ করেন। পরমাণু চুক্তি গ্রহণ ছাড়া বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবেও তিনি সদর্থকভূমিকা পালন করেছেন।

ভারতীয় অর্থনীতির সংস্কার করে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার পরিসরকে বাড়িয়ে দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি বাণিজ্যিক ও প্রত্যক্ষ করের সরলীকরণে জোর দেন। সমাজ সেবামূলক প্রকল্প ও জাতীয় সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ করে ২০১০-এ তিনি এশিয়ার শ্রেষ্ঠ অর্থমন্ত্রী হিসেবে পুরস্কৃত হন।

রাষ্ট্রপতি:

২০১২ সালের ২৫ জুলাই তিনি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হন এনডিএ-র প্রার্থী পি. এ. সাংমা-কে হারিয়ে। অনেকে ভেবেছিলেন লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। তাছাড়া তিনি তার পূর্বসূরী এ পি জে আব্দুল কালামের মতাে অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। কিন্তু ভােটের ফল দেখিয়ে দেয় নিছক রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রণব মুখােপাধ্যায়ের মূল্যায়ন অসম্ভব।

৭১ শতাংশেরও বেশি ভােট পেয়ে প্রথম বঙ্গসন্তান হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে পা রাখেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অটুট থেকে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ৩৭ জন আসামীর প্রাণভিক্ষার আবেদন খারিজ করে দেন। এমনকি ২০১৮ সালে যখন তিনি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি তখন নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সদর দপ্তরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং কংগ্রেসের কাছ থেকে বার্তা গেলেও এ বিষয়ে তিনি তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন নি।

মৃত্যু:

তিনি পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ায় প্রায় তিন সপ্তাহ সেনা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পরীক্ষায় তার করােনা পজিটিভ এসেছিল। অস্ত্রোপচারের পর তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন এবং একবার ক্ষীণ আশা জাগিয়েও তিনি চলে গেলেন—আজীবন লড়াই করেও। তবে কোভিড প্রােটোকল মেনে তাঁর শেষকৃত্য অনেকে মেনে নিতে পারেননি, শেষ চোখের দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তাঁর গুণমুগ্ধরা।

উপসংহার:

বাঙালি প্রণব মুখােপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন নি বাঙালি হিসেবে এই খেদ থেকেই যাবে। তবে গলি থেকে রাজপথ স্বপ্নের উড়ান-এর কীর্তিগাথার মালিক কীভাবে তার সমন্বয়ী ভাবনা, সহযােগিতার মাধ্যমে এগিয়ে চলার মন্ত্রকে আয়ত্ত করেছিলেন, কী অধ্যবসায়, ধৈৰ্য্য, সাহস ও বুদ্ধি থাকলে অসাধ্যসাধন করা যায়—সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বাঙালি তথা ভারতবাসী তাদের মণিকোঠায় প্রণব মুখার্জীকে কে অমর করে রাখবেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।



error: Content is protected !!