ভাত – মহাশ্বেতা দেবী, উচ্চমাধ্যমিক বিষয় – বাংলা ভাত [MCQ, SAQ, DTQ]

ভাত 
মহাশ্বেতা দেবী
লােকটার চাহনি বড়াে বাড়ির বড়াে বউয়ের প্রথম থেকেই ভালাে লাগেনি। কী রকম যেন উগ্র চাহনি। আর কোমর পর্যন্ত ময়লা লুঙ্গিটা অত্যন্তই ছােটো। চেহারাটা বুনাে বুনাে। কিন্তু বামুন ঠাকুর বলল, ভাত আবে কাজ করবে। কোথা থেকে আনলে ? এ সংসারে সব কিছুই চলে বড়ো পিসিমার নিয়মের বাড়া পিসিমা বড় বউয়ের পিসি শাশুড়ি হন। খুবই অদ্ভুত কথা। তার বিয়ে হয়নি।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
সবাই বলে, সংসার ঠেলবার কারণে অমন বড়ােলােক হয়েও ওরা মেয়ের বিয়ে দেয়নি। তখন বউ মরে গেলে বুড়াে কর্তা সংসার নিয়ে নাটা-ঝামটা হচ্ছিল। বড়াে বাড়ির লােকেরা বলে, ওঁর বিয়ে ঠাকুরের সঙ্গে। উনি হলেন দেবতার সেবিকা। বড়ো বাড়িতে শিবমন্দিরও আছে একটা। বুজাে কর্তা এ রাস্তার সবগুলাে বাড়িই শিব-মহেশ্বর-ত্রিলােচন- উমাপতি, এমন বহু নামে শিবকে দিয়ে রেখেছিলেন। দূরদর্শী লােক ছিলেন। তার জন্যই এরা করে খাচ্ছে। বাড়াে পিসিমা নাকি বলেছিলেন, উনি আমার পতিদেবতা। মানুষের সঙ্গে বিয়ে দিও না এসব কথা সত্যি না মিথ্যে কে জানে।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
বড়াে পিসিমা চিরকাল এ সংসারে হেশেল দেখেছেন, ভাড়াটে বাড়িতে মিস্তিরি লাগিয়েছেন এবং তাঁর বাবার সেবা করেছেন। বড়াে বউয়ের কথা শুনে বড়াে পিসিমা বলেন, কোথা থেকে আনিলে মানে? ঝড়জলে দেশ ভেসে গেছে। আমাদের বাসিনার কে হয়। সেই ডেকে আনলে। বড়াে বউ বলে, শী রকম দেখতে !
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
ময়ুরছাড়া কার্তিক আসবে নাকি? তোমরা তাে দশটা পয়সা দিতে পারবে না প্রাণে ধরৈ। এই চোদ্দো দফায় কাজ করবে, পেটে দুটো খাবে বইতাে নয়। কেনা চাল নয়, বালা থেকে চাল আসছে। তা দিতেও আঙুল বেঁকে যাচ্ছে? বড়াে বউ চুপ করে যায়। বড়াে পিসির কথায় আজকাল কেমন যেন একটা ঠেস থাকে। তােমাদের মানে কী? বড়াে পিসিমা কি অন্য বাড়ির লােক নাকি? বাড়া পিসিমা শেষ খোঁচাটা মারেন। তোমার শশুরই মরতে বসেচে বাছা। সে জন্যেই হােম-যক্তি হচ্ছে।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
তার জন্য একটা লােক খাবে….. বাড়া বষ্ট কোনাে কথা বলে না। সব কথাই সত্যি। তার শশুরই মরতে বসেছেন। বিরাশি বছরটা অনেক বায়োস। কিন্তু শশুর বেশ টনকো ছিলেন। তবে ক্যানসার বাল কথা। ক্যানসার যে লিভারে হয় তাই লড়ো ব
জানতাে না। বড়াে বউ প্রায় দৌড়ে চলে যায়। আজ অনেক কাজ। মেজ বড় উনান পাড়ে বসেছে। শাশুড়ির মাছ খাওয়া বুঝি ঘুচে যায়। তাই কয়েকদিন ধরে বড়াে ইলিশ, পাকা পােনার পেটি, চিতলের কোল, ডিমপােরা ট্যাংরা, বড়ো ভেটকি মাছের যজ্ঞি লেগেছে। বেঁধে-বেড়ে শাশুড়িকে খাওয়ানাে তার কাজ।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
শশুরের ঘরে নার্স। বড়াে বউ এখন গেল সে ঘরে। সে একটু বসলে পরে নার্স এসে চা খেয়ে যাবে। সেক্স ছেলে বিলেতে। তার আসার কথা ওঠে না। ছােটো মেজ ও বড়াে ঘুমােচ্ছে। এ বাড়ির ছেলেরা বেলা এগারােটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না। সেই জন্যই তাদের চাকরি করা হয়ে ওঠেনি। আঠারেখানা দেবত্র বাড়ি আর বাদা অঞ্চলে অসাগর জমি থাকলে কাজ বা কার কে?
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
শুরের ঘরে বসে বড়ো বউ ভাবতে চেষ্টা করে শ্বশুর নেই, সে অবস্থাটা কেমন হবে। ক্যানসার, লিভারে ক্যানসার, তা আগে বােঝা যায়নি। বােঝা গেল যখন, তখন আর কিছু করবার নেই। বড় বড় ভাবতে চেষ্টা করে, তখনও চাদ সূর্য উঠবে কি না। শশুর তার কাছে ঠাকুরদেবতা সমান। তাঁর জন্য দই পেতে ইসবগুল দিয়ে শরবত করে দিতে হতাে, শত ঠাকুর আসুক, তিনি খেতে আসার পাঁচ মিনিট আগে বড়াে বউকে করতে হতাে রুটি-লুচি। তার বিছানা পাততে হতাে, পা টিপতে হাতে। কত কাজ করতে হত সারা জীবন ধরে। এখন সে সব কি আর করতে হবে না, কে জানে।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
ডাক্তাররা বলে দিয়েছে বলেই তাে আজ এই যঞ্জি-হেম হচ্ছে। ছােটো বউয়ের বাবা এক তান্ত্রিক এনেছেন। বেল, ক্যাওড়া, অশ্বথ, বট, তেঁতুল গাছের কাঠ এসেহে আধ নন করে। সেগুলাে সব এক মাপে কাটতে হবে। কালাে বেড়ালের লােম আনতে গেছে ভজন চাকর। শােন থেকে বালি, এমন কত যে ফরমাশ।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
তা ওই লােকটাকে ধরে আনা কাঠ কঢ়িার জন্যে। ও নাকি কদিন খায়নি। বাসিনী এনেছে। বাসায় থাকে, অথচ ভাতের আহিংকে এতখানি। এ আবার কী কথা? বাসায় চালের অভাব নাকি? দেখাে না একতলায় গিয়ে। ভােলে ভােলে কত রকম চাল থরে থরে সাজানাে আছে। নার্স এসে বসে। বড়াে বউ নেমে যায়। আজ খাওয়া-দাওয়া করে সারতে হবে তান্ত্রিক হােমে বসবার আগে। হােম করে তান্ত্রিক শ্বশুরের প্রাণটুকু ধরে রাখবেন। তান্ত্রিক নীচের হল-ঘরে বসে আছেন। বড়াে পিসিমা বলেন, নামতে পারলে বাহা? চালগুলাে তাে বের করে দেবে? -এই যে দিই।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
ত্তিঙেশাল চালের ভাত নিরামিষ ডাল তরকারির সঙ্গে। রামশাল চালের ভাত মাছের সঙ্গে। বড়ােবাবু কনকপানি চাল ছাড়া খান না, মেজে আর ছােটোর জন্য বারােমাসি পদ্মজালি চাল রান্না হয়। বামুন চাকর কি-দের জন্য মােচা সাপ্টা চাল। বাদার লােকটি কাঠ কাটিতে কাটতে চোখ তুলে দেখে। চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসে
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
-হ্যা। বাসিনী, এত নানানিধি চাল?
-বাবুরা খায়।
– ওই পাঁচ ভাগে ভাত হয় ?
—হাৰে নে? বাদায় এদের এত জমিম। চাল এনে পাহাড় করেছে। বাড়া পিসিমা বেচেও দিচ্ছে না শুল্কে।
আমিই বেচতেছি সে চাল।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
-বাদায় এদের চাল হয়! তা দে দেখি বাসিনী। এক মুষ্টি চাইল দে। গালে দে জল খাই। বড় ঝ্যামন আঁচড় কাটতিছে পেটের মদ্যিখানে। সেই ক’দ্দিন ঘরে আদা ভাত খাই না। দে বাসিনী ব্যাগ্যতা করি তাের।
—আরে আরে! কর কি উচ্ছব দাদা। গা সম্পর্কে দাদা তাে হও। কেন বা এমন করতেছ। পিসিমা দেকতে পেলে সব্বনাশ হবে। আমি ঠিক তাগেবাগে দে ব্যাব। তুমি হাত চালিয়ে নাও দেকি বাবা। এদেরকে বলিহারি ঝাই। এট্টা লােক কদিন খায়নি শুনচ। আগে চাষ্ট্রি খেতে দে।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
বাসিনী চালগুলি নিয়ে চলে যাবার সময়ে মাথা নাড়তে নাড়তে চলে যায়। লােকটির নাম উৎসব। চিরকালই যে উচ্ছব নাইয়া নামে পরিচিত। গত কয়েকদিন সে সত্যিই খায়নি। কপালটা মন্দ তার। বড়ােই মন্দ। যত দিন রান্না খিচুড়ি দেয়া হচ্ছিল ততদিন সে খেতে পারেনি! অ চক্ষুনীর মা। চক্ষুরে! তােমরা রা কড়ি না ক্যান—কোতা অইলে গাে!
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
বস্তুত এ সব বলে সে যখন খুঁজছিল বউ ছেলে মেয়েকে তখন তার বুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল। একদিন তুমুল ঝড়বৃষ্টি। ছেলে-মেয়েকে জাপটে-সাপটে ধরে বউ কাপছিল শীতে আর ভয়ে। সে ঘরের মাঝখুঁটি ধরে মাটির দিকে দাবাচ্ছিল। মাঝ-খুঁটিটি মাতাল আনন্দে টলছিল, ধনুষ্টঙ্কার রােগীর মতাে কেঁপেতেঁকে উঠছিল। উচ্ছব বলে চলছিল ভগমান? ভগমান! ভগমান! কিন্তু এমন দুর্যোগে ভগবান ও কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুমােন বােধ করি। ভগমান! ভগমান! উচ্ছব বলছিল। এমন সময়ে মাতলার জল বাতাসের চাবুকে ছটফটিয়ে উঠে এসেছিল। জল উঠল। জল নামল! উচ্ছবদের সংসার মাটিতে লুটোপুটি গেল।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
সকাল হতেই বােঝা গিয়েছিল সর্বনাশের বহরখানা। তারপর কয়েকদিন ধরে ঘরের চালের নীচ থেকে কোনাে সাড়া পাবার আশায় উচ্ছব পাগল হয়ে থাকে। কে, কোথায়, পাগল নাকি উচ্ছব? সাধন পাশের কথা উচ্ছব নেয় না। সাধন বলে, তােরেও তাে টেনে নেহেল। গাছে বেধে রয়ে গেলি। উছ বলে, রা কাড় আ চনার মা! ঘরের পাশ ছেড়ে সে নড়তে চায় না। তা ছাড়া টিনের বেশ একটা মুখবন্ধ কৌটো ছিল ঘরে। তার মধ্যে ছিল নিভুই উচ্ছবের জমি-চেয়ে দরখাস্তের নকল। উমহুৰ নাইয়া।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
পিং হরিচরণ নাইয়া। সে কৌটোটা বা যা আর নেই, যা ঝড়-জল-মাতলার গর্ভে গেছে তাই খুঁজে খুঁজে উচ্ছব পাগল হয়েছিল। তাই রান্না খিচুড়ি তার গাওয়া হয়নি। তারপর যখন তার সম্বিত ফিরল, তখন আর খিচুড়ি নেই। ড্রাইডােল। চালগুলি সে চিবিয়ে। জল খেয়েছিল। এভাবে কিছুদিন যায়। তারপর গ্রামের লােকজন বলে, মরেছে যারা তাদের ছরাদ্দ কান্ত হয়। একাজ করার জন্যে তারা মহানাম শতপথিকে খবর দেয়।
ভাত – মহাশ্বেতা দেবী,
কিন্তু মহানাম এখন আর দুটো গ্রামে অনুরূপ শ্ৰক্ষিশান্তি সেরে তবে এখানে আসবে। গ্রামবাসী অন্যেরা মাছ-গুগলি-কাকড়া যা পাচ্ছে ধরতে লেগেছে। উছকে সাধন বলে, তুমি একা কলকেতা যা বলে নেচেই ৰা উটলে কেন? সরকার ঘর কত্তে খরচা দেবে শুনছ না? উদ্ভিব হঠাৎ খুব বুদ্ধিমান সাজাতে চায় ও বলে, সে এট্রা কতা বটে। ঝড় জলে কার কী হলাে, মা-ভাই-বােন আছে না গেছে দেখতে বাসিনী আসতে পারেনি। তার বােন আর ভাজ কলকাতা যাচ্ছিল। ওরা কিছুকাল ঠিকে কাজ করবে। উচ্ছব আগেও গিয়েছিল একবার।
ভাত  MCQ
বাসিনী যেখানে কাজ করে সে ঘর বাড়ি দেখেছিল বাইরে থেকে। বার-বাড়িতে ঠাকুর দালান আছে, মন্দিরের মাথায় পেলের ত্রিশুলটা দেখেছিল। বাসিনীর মনিব বাড়িতে হেলা ঢেলা ‘ভাত, এ গল্প গ্রামে সবাই শুনেছে। উচ্ছবের হঠাৎ মনে হয় কলকাতা গিয়ে খেয়ে মেখে আসি। কেন মনে হয়েছিল তা সে বলতে পারে না।
ভাত  MCQ
উপােসে, এক রাতে বউ ছেলে মেয়ে ঘরদোর হারিয়ে সে যেন কেমন হয়ে যাচ্ছিল। মাথার ভেতরটা কিমঝিম করে, কোনাে কথা গুছিয়ে ভাবতে পারে না। খুব ভাবে সে, না না। এইবার গুছিয়ে ভাবতে হচ্ছে। কী যে হলাে তা একনাে দিশে হচ্ছে না তেমন। ভাবতে গেলেই তার প্রথমে মনে হয় নে গেছ আসার আগেই ধান গাছ থেকে সবুজ রং চলে যেতে থাকে। কার্তিক মাসেই ধান খড় হয়ে গেল। তা দেখে উচ্ছব মাথায় হাত দিয়েছিল।
ভাত  MCQ
সতীশ মিস্তিরির হরকুল, পাটনাই, মােটা তিন ধানে মড়ক। উচ্ছব তাে সতীশের কাজ করেই ক’মাস বেঁচে থাকে। অ উচ্ছব, মনিবের ধনি যায় তাে তুই কাদিস কেন ? কাদব না, সাধনবাবু, কবি না? লক্ষ্মী না আসতে সেধে ভাসনি যাচ্ছে তা দিব না এতটুকু? আমারা খাব কী? তা গুছিয়ে চিন্তা করতে বসলে আগে মনে হয় ধানক্ষেতে আগুন লাগার কথা। তারপরই মনে পড়ে যে রাতে ঝড় হয়।
ভাত  MCQ
সেই সম্পন্ন। অনেকদিন বাদে সে পেট ভরে খেয়েছিল। এই এত হিণে সে আর এত গুগলি সেদ্ধ নুন আর লঙ্কা পােড়া দিয়ে। দিনটা এমন ছিল যে সেদিন গ্রামের সকল উচ্ছধরা ভরা পেট খেয়েছিল। খেতে খেতে চমুনীর মা বলেছিল—দেবতার গতিক ভালাে নয়কে। লৌণে নে কারা বেইরােচে বুজি বা বােট মারা পারে, এ কথাটাও বেশ মনে পড়ে। তারপরেই মনে পড়ে মাঝ-খুটিটা সে মাটির দিকে ঠেলে ধরে আছে। মা বসুমতী কেমন সে খুটি রাখতে চায়নে, উগরে ফেলে দেবে।
ভাত  MCQ
ভগমন ! ভগমান ! ভগমান! তারপর বিঈমকে ক্ষণিক আলােয় দেখা মাতলার সফেন হ্রল ছুটে আসছে। ব্যাস্, সব খােলামেলা, একাকার তারপর থেকে। কী হল। কোথায় গেল সব, তুমি কোথায়, আমি কোথায়। উমিচুৰ নাইয়া। পিং হরিচরণ নাহয়। কাগজসহ কৌটোটি
ভাত  MCQ
কোথায়। বড়ো সুন্দর কৌটোখানি গো ! চমুনীদের যদি রেখে যেত ভগবান, তাহলে উচ্ছবের বুকে শত হাতির বল থাকত আজ। তাহলে সে কৌটো নিয়ে সবাই ভিয়ে কেরত। সতীশবাবুর নাতি ফুট খায়। উচ্ছব কৌটোটো চেয়ে এনেছিল। অমন কেটো থাকলে দরকারে একমুঠো ফুটিয়ে নেয়া যায়। চমংকার কৌটো। -কী হলাে, হাত চালাও বাছা। ওদিকেশুযচেকা, হােম হবে, তা কাটিগুনাে দাঁড়িয়ে দেখচ? বড়াে পিসিমা -বড়াে খিদে নেগেচে মা গাে!
ভাত  MCQ
—এই শােন কতা! ভাত নামলেও খাওয়া নেই একন। তান্ত্রিকের নতুন বিধেন হল, সর্বস্ব বেঁধে রাখাে, হােম হলে খেও। তুমি হাত চালাওঁ।
ভাত  MCQ
উচ্ছব আবার কাঠ কাটতে থাকে। প্রত্যেকটি কাঠ দেড় হাত লম্বা হবে। ধারালাে কাটারিটি সে তােলে ও নামায়। ফুটন্ত ভাতের গন্ধ তাকে বড়াে উতলা করে। এদিক ওদিক চেয়ে বাসিনী বুড়ি বােঝাই শাক নিয়ে উঠোনে ধুতে আসে। ঝপ করে একটা ঠোঙা তার হাতে দিয়ে বলে, ছাতু খেয়ে জল খেয়ে এসাে রাস্তার কল হতে। দেরি কোনাে না মােটে। এ পিশাচের বাড়ি কেমন তা ঝাননি দাদা। গরিবের গতর এরা শস্তা দেকে। কে মরতেচে হা বাসিনী।।
ভাত  MCQ
-তেকেলে বুড়াে। বাড়ির কত্তা। মরৰেনে? ওই ঝে হােমের জোগান দিচ্ছে, ওই মুটকি ওনার খাস ঝি। কত্তা মালে পরে ওকে সাত নাতি না মেরেছি তাে আমি বাসিনী নই। তেকোলে বুড়াে মরছে তার নানিব্য হােম ! ছাতু ক’টি নিয়ে উচ্ছব বেরিয়ে যায়। বাপ রে! এত তরকারি, এত চাল এত মাছ এ একটা যজ্ঞি বটে! সব নাকি বাদার দৌলতে। সে।কোন বাদা? উছুবের বাদায় শুধু গুগলি-গড়িকচুশাক-সুশনাে শাক। উচ্ছব ছাতুটুকু একটু খায়, মিষ্টির দােকানে ভিড় চেয়ে নিয়ে জল খায় ? হাতু নাকি পেটে পড়লে ফুলে ফেঁপে ওঠে। তাই হােক। পেটের গভির ভরুক। কিন্তু সাগরে শিশির পড়ে। উচ্ছব টের পায় না কিছু। সে আবার ফিরে আসে।
ভাত  MCQ
—কোথা গেছলে ?
এটু বাইরে গেলাম মা!
কাঠ কাটলে হােম, হােম হলে ভাত, উচ্ছব তাড়াতাড়ি হাত চালায়। মেজ বউ চেচিয়ে বলে, খাবার ঘর মুছেচ বাসিনী ? সব ক্লান্না তুলতে হবে। বাসিনী বলে, মুছিচি! বড়াে বউ হেকে বলে, সব হয়ে গেল?
—মাচের ঘরে সব হলাে।
ভাত  MCQ
এসব কথা শুনে উচ্ছব বুকে বল পায়। ভাত খাবে সে, ভাত। আগে ভাত খাবে, জিবে ভাতের সােয়লি নেবে। আসার সময়ে গা-জ্ঞেয়াতি বলেছিল, কলকেতা ঝা ঝকা, তখন কালীঘাটে ওসের ছরাল সেরে দিও। অপঘাতে গেছে ওরা; হ্যা, তাও করবে উহব, মহানাম শতপতি তাে এল না। এলে পরে নদীর পাড়ে সারবন্দি দুরাদ হবে। উচ্ছব কালীঘাটে ছরাদ সারবে। সতীশবাবু বলেছে, উচ্ছবের মতিচ্ছিন্ন হয়েছে বই তাে নয়। বউ ছেলে মেয়ে অপঘাতে মরল, মানুষ পাগল হয়ে যায়। উচ্ছব ভাত ভাত করচে দেখ।
ভাত  MCQ
তুমি ল বুঝবে সতীশবাবু! নদীর পাড়েও থাক না, মেটে ঘরেও থাক না। পাকা ঘর কি ঝড় জলে পড়ে? তােমার ধান চালও পান্না ঘরে রেখেছ। চোর ডাকাতে নেবে না। দেশ জোড়া দুর্যোগেও তােমার ঘরে রান্না হয়। ভাত খেতে দিলে না উচ্ছবকে। তােকে এগলা দিলে চলবে? তাহলেই পালে পালে পাপাল জুটবে নে? এ হলাে ভগবানের মার। এর চোট থেকে তােকে বাঁচাতে পারি ?—তা তুমি ভাত দিলে না, দেশে ভাত নেই।
ভাত  MCQ
সেই যে পোকায় ধান নষ্ট, সেই হতেই তাে উচ্ছবের আধ-পেটা সিকি-পেটা উপােসের শুরু। পেটে ভাত নেই বলে উচ্ছবও প্রেত হয়ে আছে। ভাত খেলে সে মানুষ হবে। তখন বড় ছেলে মেয়ের জন্যে কাঁদবে। পুঃখ তাে ওর হয়নি। ও শুধু পাগল হয়ে বড় মেয়েকে ডেকেছিল কয়েক দিন ধরে। তখনি উচ্ছব প্রেত হয়ে গেছে। মানুষ থাকলে ও ঠিকই বুঝত যে জলের টানে মানুষ ভেসে গেছে।
ভাত  MCQ
কত গােরু মােয ভেসে গেল, চার মা তাে কোন ছার। উচ্ছব কাঠ কাটা শেষ করে। আড়াই মন কাঠ কাটলাে সে ভাতের হুতাশে। নইলে দেহে ক্ষমতা ছিল না। পাঁচ ভাগে কাঠ রেখে আসে দালানে। উঠোনে কাঠের কুচো, টুকরাে সব ঝুড়িতে তুলে উঠোন ঝাট দেয়। তারপর বড়াে পিসিমাকে দেখতে পেয়ে শুধায়, মা! বাইরে ঝেয়ে বসব? বড়াে পিসিমা তখনই জবাব দেয় না। কেননা তান্ত্রিক হঠাৎ “ওঁং হ্রীং ঠং ঠং ভাে ভাে রােগ শৃণু শৃণু’ বলে গর্জে উঠে রােগকে দাঁড় করান, কালাে বেড়ালের লােমে রােগকে বেঁধে ফেলেন ও হােম শুরু করেন।
ভাত  MCQ
একই সঙ্গে ওপর থেকে নার্স নেমে এসে বলে, ডাক্তারকে কল দিন। -বড়াে মেজো ও ছােটো ঘুম ভাঙা চোখে বিস মুখে হামের ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, বাসিনী উচ্ছবকে বলে, তুমি ঝেয়ে বাইরে বােসাে দাদা। না, মন্তর বললে বাট। কেমন হাঁকুড় পাড়লে অমনি কত্ত টাল দিলে ? কত্তার দেহ থেকে ব্যাদিটা হাঁচোড় পাচাড় করে বেইলি এল। চ্যান করবে তা করে না কেন ?
ভাত  MCQ
—একন চান করব না। মাতায় জল পড়লে পেট মানাতে চায়নে মােটে। বাইরে এসে উচ্ছব শিবমন্দিরের চাতালে বসে। কেমন মন্দির, কেমন চাতাল! বাপরে! এসব নাকি বাদার দৌলাত। সে বাদাটা কোথায় থাকে ? ভাত তাে খায়নি উচ্ছব অনেক দিন। ভাত খেয়ে দেহে শক্তি পেলে উচ্ছল সেই বাদটা খুজে বের করবে। উচ্ছাবের মতাে আরাে কত লােক আছে দেশে। তাদেরও বলবে। মন্দিরের চাতালে তাস পােটি তিনটি ছেলে। তারা বলে, বুড়ােকে বাঁচিয়ে তুলতে হােম হচ্ছে।
ফালতু ?
ভাত  MCQ
—বী ফালতু বেচে থেকে ও কত দিন জীবন পাবে? একশাে যত সব ফালতু। উচ্ছৰ চোখ বোঁজে। এমন যজ্ঞির পরেও বুড়ােকা বেশিদিন বাঁচবে না? কী কাণ্ড! মাতলা নদী যদি সে রাতে পাগল হয়ে মাতাল মাতনে উঠে না আসে তাে উছরে বউ, চমুনী, ছােটো খােকা অনেকদিন বাঁচে। উচ্ছবের চোখের কোলে জল গড়ায়। ভাত খাবে আজ। সেই আশাতেই প্রেত উচ্ছব মানুষ হয়ে গেল নাকি? বাড়ে ছেলে হােটো খােকার কথা মনে হতে চোখে জল এল হঠাৎ? ভাতই সব। অন্ন লক্ষ্মী, অষ্ট লক্ষ্মী, অন্নই লক্ষ্মী, ঠাগমা বলত। ঠাগমা বলত, রম্ন হল না ।
ভাত  MCQ
– হে কানহু কেন?
—আমারে শুদোচ্ছেন বাবু?
—হাঁ হে।।
ভাত  MCQ
আবাদ থেকে আসতেছি বাবুগাে! ঝড় জলে সব নাশ হয়ে, ঘরের মানুষ.. -ও তাস পিটানাে ছেলেগুলি অস্বস্তিতে পড়ে। বয়স্ক ছেলেটি বলে, ঠিক আছে ভাই ঘুম এসাে। উচ্ছল সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমিয়েই থাকে সে অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ। অবশেষে কার পায়ের ধাক্কা খেয়ে ঘুম ভাঙে তার! ইস্! এ যে সাঁঝ বেলা গাে। কিন্তু তাকে ঠেলা দিচ্ছে কেন লােকটা?
ভাত  MCQ
_ওঠো, ওঠো কে তুমি?
—চুরির মতলবে পড়ে আছি?
-না বাবু, এই বাড়িতে কাজ তেছিলাম।
–ওঠো, ওঠো।।
উচ্ছব উঠে পড়ে। তারপর সে অত্যন্ত ঘাবড়ে যায়। রাস্তায় বেশ কয়েকটি গাড়ি। লােকের ছােটো ছােটো জটলা।
—কী হয়েছে বাবু?
ভাত  MCQ
কেউই তার কথায় জবাব দেয় না। উচ্ছব বাড়িতে ঢােকে। ঢুকতেই বড়ো পিসিমার বিলাপ শােনে, তােমার ছোটো বেয়াই কি ডাকাত সন্নেসী আনল গাে দাদা! যন্ত্রি হলাে আর তুমিও মল্পে। অ-দাদা! তুমি যে বিরেশিতে যাবে তা কে জানত বল গো ! তোমার যে আটনিকই বছর বেঁচে থলির কথা গো দাদা। বাসিনীকে দেখতে পায় না উচ্ছব। তবে খুব কমব্যস্ততা দেখে। কেন না এলে বেরুনাে নেই। কে যেন বলে।
—কেত্তন কী বলছিস বড়াে খােকা। বােনরা, দিদিরা আসুক! বাড়াে পিসিমা বলেন। চয়ন বটিছ কেউ ?
—খাটের টাকা কে নিয়েছে ?
বাগবাজারে, ফোন করাচো?
ভাত  MCQ
—ফটা দেকে দাও নিকি কেউ। খই, ফুল, ধুতি। শব বস্তুর…উচ্ছব পাঁচিলের গায়ে সিটিয়ে লেপটে পাড়িয়ে থাকে। কত যে সময় যায়, কত কী যে হতে থাকে।
ভাত  MCQ
মক্স খাট আসে। রাতে রাতে বের কত্তে হবে। রাতে রাতে কাজ সারতে হবে। নইলে দোষ লাগবে। অনেক তোড়জোড় হয়। মেয়েরা বাসে কঁাদে। হােম যজ্ঞ করেও বুড়ো কর প্রাণটা যে রইল না, তাতে তান্ত্রিককে এতটুকু কুণ্ঠিত দেখা যায় না। তিনি লাইন করে ফেলেন তাঁর। ফলে বড়াে পিসিমা চেঁচিয়ে বলতে থাকেন, তিন ছেলে হােম ছেড়ে উঠে গেল যে?
ভাত SAQ
এসব কাজে বিগ্নি পড়লে রক্ষে আছে?—একথার আলােচনায় খুব সরগরম হয় বাড়ি। শােকের কোনাে ব্যাপার থাকে না। বাড়ির উনই জ্বলবে না। রাস্তার দোকান থেকে চা আসতে থাকে। অবশেষে রাত একটার পর বুড়াে কল্লা বােম্বাই খাটে শুয়ে নাচতে নাচতে চলে যান। পেশাদারি দক্ষ শববাহকরা আধা দৌড় দেয়। ফলে কীর্তন দলও দৌড়াতে বাধ্য হয়। বড়াে পিসিমা বলেন, বাসিনী, সব্বাস রান্না পথে ঢেলে দিগে যা। ঘরদোর মুক্ত
কর সব। বটুৱা যাও না। দাঁড়িয়ে বা রইলে কেন?
ভাত SAQ
উচ্ছাবের মাথার মধ্যে যে মেঘ চলছিল তা সরে যায়। সে বুঝতে পারে সব ভাত ও পথে ফেলে দিতে যাচ্ছে বাসিনী বলে, ধর দেখি দাদা।
ভাত SAQ
—এই যে ধরি। উচ্ছবের মাথায় এখন বুদ্ধি স্থির, সে জানে সে কী করবে।
—আমাকে সে ভারিটা। মােটা চালের ভাতের বড়াে ডেকচি নিয়ে সে বলে, দূরে ফেলে দে আসি।
-হা হা লয়তাে কুকুরে ছেটাবে, সকালে কাকে ঠোক দেবে—বামুন বলে। বেরিয়ে এসে উচ্ছব হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে। খানিক হেঁটে সে আধা দৌড় মারে। ভাত, বাসার ভাত তার হাতে এখন। পথে ঢেলে নেবে? ককি-কার খাবে? “দাদা এও বাসিনী প্রায় ছুটে আসে, অশুড় বাড়ির ভাত খেতে নি দাদা।
—খেতে নি? তুমিও ঝোয়ে বামুন হয়েছ?
— নানা ব্যাগ্যতা করি—
ভাত SAQ
উচ্ছব ফিরে দাঁড়ায়। তার চোখ এখন বাদার কামটির মতাে হিংস্র। দাঁতগুলো বের করে সে কামিটের মতােই হিংস্র ভর্শি করে। বাসিনী থমকে দাঁড়ায়। উচ্ছব দৌড়তে থাকে। প্রায় এক নিশ্বাসে সে স্টেশনে চলে যায়। বাস ও খাবল খাবল ভাত খায়। ভাতে হাত ঢুকিয়ে দিতে সে স্বর্গ সুখ পায় ভাতের স্পর্শে। চনুনীর মা কখনাে তাকে এমন সুখ দিতে পারেনি। খেতে খেতে তার যে কী হয়। মুখ ডুবিয়ে দিয়ে যায়। ভাত, শুধু ভাত। বাদার ভাত। বাদার ভাত খেলে তাৰেতাে সে আসল বাটার খোঁজ পেয়ে যাবে একদিন। আছে, আরেকটা বান্দা আছে।
ভাত SAQ
সে বাদাটার খোজ নির্ঘাত পাবে উচ্ছব। আরাে ভাত খেয়ে নি। চনী রে! তুইও খা, চমুনীর মা খাও, ছােটো খােক খা, আমার মধ্যে বাসে তােরাও খা! আঃ ! এবার জল খাই, জল! তারপর আরাে ভাত। ভােরের টেনে চেইপে বাসে সােজা ক্যানিং যাচ্ছি। ভাত পেটে পড়েছে এখন ব্যানচিঝে ক্যানিং হয়ে দেশঘরে যেতে হবে। উচ্ছব হাঁড়িটি জাপটে কানায় মাথা ছুইয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
ভাত SAQ
পেতলের ডেকচি চুরি করার অপরাধে সকালে লােকজন উচ্ছবকে সেখানেই ধরে ফেলে। পেটে ভাতে ভার। নিয়ে উচ্ছব ঘুমিয়েছিল, ঘুম তার ভাঙেনি। মারতে মারতে উচ্চবকে ওরা থানায় নিয়ে যায়। আসল বাদাটার খোঁজ করা হয় না আর উচ্ছবের। সে বাদাটা বড়াে বাড়িতে থেকে যায় অচল হয়ে।
                                                                                      ৮                                                                             

 

RECENT POST

LATEST POST