নােবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়


নােবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

ভূমিকা :

১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেনের পর অর্থনীতিতে বাঙালি আবার বিশ্বজয়ী, সেই জয়ের মুকুট ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনােলজির অর্থনীতিবিদ, প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে। বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষে বাঙালির মেধার এই সম্মান বাঙালি তথা বিশ্ববাসীকে গর্বিত করবে।

বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণের যে মডেল তিনি ব্যবহার করেছেন তাতে অর্থনীতি তার তাত্ত্বিক জগৎ থেকে সরে এসে বিশ্বের দারিদ্র্য দূরীকরণ তথা মানুষের জীবনধারণের মান ও আদর্শকে যথার্থ পথ দেখাবে।

শিক্ষা :

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৬১ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মুম্বাইতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা দীপক ব্যানার্জী ছিলেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান এবং মা নির্মল সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সােস্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা-র অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপিকা এবং তিনি মারাঠী।

ড. ব্যানার্জী সাউথ পয়েন্ট স্কুল ও প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশােনা করেন (১৯৮১), স্নাতকোত্তর করেন দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৮৩) এবং পিএইচডি হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৮৮)তে। তাঁর পিএইচডি-র বিষয় ছিল ‘এসেন্স ইন ইনফরমেশন ইকনমিকস’।

শিক্ষা,অভিজ্ঞতা ও দর্শন :

ছােটবেলা থেকে তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পড়ার বাইরে খেলাধূলা, রান্না করা, গান বাজনায় তার আগ্রহ ছিল যথেষ্ট। বাবা তার কাছে আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। তিনি এমন পরিবারের মানুষ যেখানে বাবা বাঙালি, মা মারাঠি। তিনি ছােটবেলায় দেখেছিলেন জ্বর হলে তাকে বাড়িতে বলা হত রুটি খেতে, জ্বর ছাড়লে ভাত খাবে।

মামার বাড়িতে আবার সবাই রুটি খেতেন কিন্তু জ্বর হলে চালের খিচুড়ি খাওয়াতেন, জ্বর ছাড়লে রুটি। তার এই অভিজ্ঞতা তাঁকে অর্থনীতির গবেষণায় পথ দেখিয়েছে। কারণ মানুষের কাছে কোনাে দেশকাল নিরপেক্ষ সত্য নেই; পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং স্থানীয় বাস্তবতাই দেখাতে পারে দারিদ্র্যের বন্ধন থেকে মুক্তির দিশা।

ছােটবেলায় কাছ থেকে দেখা দারিদ্র্য তাকে একটা কথা শিখিয়েছিল, প্রথাগত অর্থশাস্ত্র গরিবদের নিয়ে তাত্ত্বিক কথা বলে। কিন্তু গরিবরাও অন্য পাঁচজনের মতাে। তাদের চাহিদা, রুচি আছে এবং তা ভিন্ন ভিন্নও বটে। প্রচলিত অর্থশাস্ত্রের নিরিখে দরিদ্রদের দেখা হয় কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হিসেবে।

তারা হয় অলস না হয় প্রবল উদ্যমী; হয় মহৎ, নয় ছিচকে, হয় অসহায় নয় প্রবল শক্তিধর। অর্থাৎ গরিব মানুষরা আর যাই হােক সাধারণ লােক নয়। অভিজিতের অভিজ্ঞতায় তাই গরিবের ছবি নতুনভাবে মাথায় আসে। তিনি দরিদ্রদের বিভিন্নতার কথা মাথায় রেখেছেন। তার অভিজ্ঞতা ও যুক্তিবােধই তাকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে।

কর্মজীবন :

বর্তমানে অভিজিৎ ‘আব্দুল লতিফ জামিল পােভার্টি অ্যাকশন ল্যাব’-এর একজন সদস্য। এছাড়া অর্থনীতির বিশ্লেষণ ও উন্নয়নমূলক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ব্যুরাে অব ইকনমিক রিসার্চ, কিইল ইনস্টিটিউট, আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স ও ইকনমিক সােসাইটির সম্মানিত ফেলাে।

নােবেল পাওয়ার কারণ :

অর্থনীতিতে ২০১৯ সালে নােবেল পেলেন যৌথভাবে অভিজিৎ ব্যানার্জী ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী এসথার ডাফললা এবং মাইকেল ক্রেমার। এঁদের তিনজনেরই কাজ বিশ্বের দারিদ্র্য দুরীকরণে নিরীক্ষণমূলক পদ্ধতি নিয়ে এবং এই কাজের স্বীকৃতিতে ননাবেল প্রাপ্তি।

এঁদের গবেষণা পদ্ধতি উন্নয়ন অর্থনীতির রূপরেখা বদলে দিয়েছে। তার রচিত ইনফরমেশন ইকনমিক্স’, সতেরটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন কোনাে এক দরিদ্র পরিবারে দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও সে বিনােদনে ও উৎসবে অর্থ ব্যয় করে। এই ব্যয় করে তারা সচেতন ভাবেই।

সেই বিষয়ে জানতে হলে সেই সব দরিদ্রদের কাছে পৌছে জানতে হবে তার কারণ, কোনাে একটা তত্ত্ব দিয়ে এর কারণ বােঝার চেষ্টা করলে তা ভুল হবে। তার মতে, যথেষ্ট ধৈর্য ও জ্ঞান নিয়ে গরিবদের কথা শুনতে হবে, বুঝতে হবে তারা আদতে কী চান।

কারণ দারিদ্র্য শুধুমাত্র অর্থের নয়, মানুষ হিসেবে প্রয়ােজনের পূর্ণ ক্ষমতা বােঝার অভাব। তাই গ্রহণযােগ্য সমাধান ছাড়া বিশ্বের কোনও সমস্যা নিয়ে কথা বলার অর্থ অগ্রগতি নয়, বরং পঙ্গুত্ব। তিনি জানিয়েছেন, উদয়পুরের মানুষ রেডিয়াে টেলিভিশন কেনার চেয়ে সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অনেক বেশি খরচ করেন।

অন্যদিকে নিকারাগুয়ায় ৫৮ শতাংশ গ্রামের গরিবের বাড়িতে রেডিয়াে এবং ১১ শতাংশের বাড়িতে টিভি রয়েছে, কিন্তু তারা উৎসবে খরচ করতে খুব একটা আগ্রহী নয়। তাই সব দরিদ্র মানুষের উন্নয়ন বা অবনমনের কারণ ও তত্ত্ব এক হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।

তার যােগ্য সহযােগী অর্থনীতিবিদ ডাফললা গরিবদের না পাওয়ার দীর্ঘ তালিকা থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বিনিয়ােগের পথ বাতলে দিয়েছেন। তিনি গরিব দেশের অনুদান ও ধনী দেশের আনুকূল্যের বিরােধী মধ্যপন্থাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর আর এক সহযােগী হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ক্রেমার উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি নিয়ে গবেষণা করে পরীক্ষামূলক পদ্ধতি প্রয়ােগ করে সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মাননান্নয়নে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছেন।

ভারতীয় অর্থনীতি ও মূল্যায়ন :

অভিজিৎ ব্যানার্জী ভারতীয় অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আশাবাদী নন। কারণ তিনি মনে করেন চটকদার প্রকল্পের ঘােষণা করে কাজের কাজ কিছু হবে না। গরিব মানুষদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এমনকি ভারত অর্থনীতির ক্ষেত্রে যেভাবে চলছে সেই সমস্যা থেকে চট করে বের করে আনা যাবে না।

চাহিদার অভাবই এখন ভারতের অর্থনীতির বড় সমস্যা। গরিব ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এমনকি নােবেল পাওয়ার আগে নােটবন্দি নিয়ে তিনি যা বলেছিলেন তা আজ সত্য। তিনি বিমুদ্রাকরণের বিপক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন—(১) আচমকা বাজারে নগদের যােগান কমলে অপর্যাপ্ত নগদের জন্য আর্থিক লেনদেন কমবে।

কারণ ভারতীয় শ্রমিকদের ৮৫ শতাংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন তারা মূলত নগদেই লেনদেন করেন। (২) বিমুদ্রাকরণের ঘােষিত উদ্দেশ্য যদি দুনীতি কমানাে হয় তাহলে নােটের সর্বোচ্চ অঙ্ক ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা করে দেওয়ায় বেনামে লােকের পক্ষে কালাে টাকা রাখা সহজ হয়ে যাবে।

উপসংহার :

বাঙালি হিসেবে এই সম্মান আপামর বাঙালির কাছে গর্বের—বাঙালির মেধা নবজাগরণের সময় থেকে যে সচল ও গতিশীল তা আরাে একবার প্রমাণিত হল। আমরা সাগ্রহে তাকিয়ে থাকব তার দেখানাে অর্থনীতির পথ ভারতীয় অর্থনীতির বর্তমান দৈন্যদশা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে ও ভারত আবার বিশ্বসভায় শ্রেষ্ঠ আসন গ্রহণ করবে।



error: Content is protected !!