তিন তালাক বিল ও নারীর ক্ষমতায়ন


তিন তালাক বিল ও নারীর ক্ষমতায়ন

ভূমিকা :

তুলসী লাহিড়ীর-র ‘ভেঁড়াতার’ নাটকে রহিমুদ্দির ফুলজানকে তালাক দেবার পর আবার ফিরিয়ে নেবার প্রশ্নে ফুলজান হদীজ খেলাপের কথা বললে উত্তরে রহিমুদ্দি ফুলজানকে বলে, “নিকার নামে বেইজ্জৎ হইলে হদীজ খেলাপ হয় না।

ছাওয়াটাকে বাঁদীর বাচ্চা বানাইলে হদীজ খেলাপ হয় না। যে মানুষটাকে একটা মুখের কথা থাকি বাঁচে, তার জীউটা দুই পায়ে থেলাইলে হদীজ খেলাপ হয় না—না?” অর্থাৎ ধর্মের আদেশ অপেক্ষা মানবিকতা যে শ্রেষ্ঠ সেকথাই এই নাটকে ব্যক্ত হয়েছে।

বর্তমানে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির বিকাশে ধর্মাচরণের বিভিন্ন পদ্ধতি ও শাস্ত্রাচার যেখানে গৌণ হয়ে পড়েছে সেখানে তিন তালাকের মতাে রীতি প্রচলিত থাকার কারণে নারীর স্বশক্তিকরণ ও ক্ষমতায়ণের লক্ষ্যে সম্প্রতি তিনতালাক বিল লােকসভায় পাশ হয়েছে।  তা নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে নানা মত থাকলেও এর উদ্দেশ্য যে মহৎ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

তালাক কী ও কেন :

তালাক’ (আরবি শব্দ তালাকা) শব্দটির অর্থ হল মুসলমানদের স্বামী ও স্ত্রীর বিবাহ সম্পর্ক ছেদ, ইংরেজি অর্থ ‘divorce’। ইসলাম ধর্মে তিন তালাক বলে যে কথাটি রয়েছে তার সঙ্গে তাৎক্ষণিক তিন তালাকের (তালাক-ই-বিদ্দত) আকাশপাতাল পার্থক্য।

ইসলামে বিবাহ বিচ্ছেদের এই প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে নিরবচ্ছিন্ন পদ্ধতিতে হওয়ার কথা, সেখানে হঠকারী সিদ্ধান্তের বশে কোনও পুরুষ তার স্ত্রীকে বিবাহের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করলে তা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযােগ্য নয়।

স্বরূপ :

এমনকি ইসলামে তালাক দেওয়ার একতরফা অধিকার শুধু পুরুষের নয়, ২২৮ নং আয়াতে নারীদেরও অনুরূপ ন্যায়সঙ্গত অধিকারের ইঙ্গিত আছে—তাকে বলে খােলা তালাক’। পুরুষদের ক্ষেত্রে তা বায়েন তালাক’।

এই বায়েন তালাক’ একই সময়ে তিনবার কিম্বা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তিনবার উচ্চারিত হতে পারে—তা মুখে, লিখিতভাবে বা সম্প্রতি মেসেজ বা ই-মেল মারফৎ হতে পারে।

এই বিধি আসলে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের একে অপরের কাছে অযাচিতভাবে বেঁধে রাখা রােধ করে, উভয়ের ভবিষ্যৎ জীবনের লক্ষ্যে। শুধুমাত্র ডিভাের্স’ না পাওয়া বা না দেওয়ার জন্য মানুষের জীবন যাতে শেষ হয়ে না যায় তার জন্যই ইসলামে দুপ্রকার তালাকের সংস্থান রয়েছে।

সুরা বাকরাহ-র ২৩১ নং আয়াতে কাউকে প্রেমহীন দাম্পত্যের ঘেরাটোপে অন্যায়ভাবে আটকে রাখার বিপক্ষে সাওয়ালের ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু এই দুধরনের তালাক যেহেতু একতরফা সম্ভব, তাই তার সুযােগ নিয়ে মূলত

সমস্যা :

কিছু পুরুষ অনেক সময় এর অপব্যবহার করে এবং তা ইসলামের চোখে কতটা গর্হিত ও নিকৃষ্ট তা না ভেবেই।

এমনকী, কোন পরিস্থিতিতে, কী ধরনের অপরাধে কোন তালাক দেওয়া ইসলাম সম্মত এবং তার পদ্ধতিগত পর্যায়গুলি ঠিক ঠিক মান্যতা পেয়েছে কিনা তা ভেবে দেখা হয় না, ভাবা হয় পারস্পরিক সংশােধন ও সম্পর্কে পুনর্জাগরণের সুযােগ দেওয়া হয়েছে কিনা।

শুধুমাত্র বহুবিবাহের সুপ্ত ইচ্ছাকে কায়েম করার জন্য কিম্বা হঠকারিতাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তালাককে অপপ্রয়ােগের দ্বারা সমস্যা সৃষ্টি করা হচ্ছে—যা সামাজিক ও আইনি দৃষ্টিতে মােটেই গ্রাহ্য নয়।

কারণ :

এই তালাক প্রথা মূলত অসহায় নারীদেরকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে রাতারাতি তারা য়ে যায় অবহেলার সামগ্রী। সন্তানদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

প্রথমত, তাৎক্ষণিক তিন তালাক সাধারণত হয় নিম্নবিত্ত পরিবারে—যারা ধর্মের কোন জ্ঞান বা নির্দেশ সম্পর্কে না জেনে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়।

এর উৎসে রয়েছে—পণের টাকা না পাওয়া, শ্বশুরবাড়ির সামান্য ভুল-ভ্রান্তি, স্ত্রীকে পছন্দ না হওয়া, সংসারে মন না থাকা ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত, ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ তালাক হয় রাগের মাথায় হঠকারিতার জন্য এবং তা হয় সংসারের অভাব-অনটন, একান্নবর্তী পরিবারের নিত্য-কলহ, বৌ-মা-ভাই-বােনের সংসারে পারস্পরিক টানাপােড়েন, ভুল বােঝাবুঝি, হতাশা ইত্যাদির জন্য।

কিন্তু রাগ প্রশমিত হবার পর অভিভাবকরা তাদের তালাক’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, মাতব্বররা বিধান দেয়, সৃষ্টি হয় সমস্যার। তৃতীয়ত, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ তালাকের ক্ষেত্রে থাকে ‘পরকীয়া’—যা স্বামী-স্ত্রী উভয়ক্ষেত্রে।

চতুর্থত, ২০ থেকে ২৫ শতাংশ তালাকে থাকে বৌ পছন্দ না হওয়া, সংসারে খাপ খাওয়াতে না পারা, আভিজাত্যের অহংকার, স্বনির্ভরতার দ্বন্দ্ব ইত্যাদি কারণ।

নতুন আইন :

২০১৯-এর আগস্ট মাসে মুসলিম মহিলা (বৈবাহিক অধিকার সুরক্ষা) বিল’ রাষ্ট্রপতির অনুমােদন পেয়ে আইনি বৈধতা পায়। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তা এক নতুন পদক্ষেপ।

২০১৮ সালের তিন তালাক অধ্যাদেশ প্রাপ্ত আইনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরকার লােকসভায় ২০১৮-র ১৭ ডিসেম্বর বিল। উত্থাপন করে এবং তা বর্তমানে আইনি রক্ষাকবচ রূপে মুসলিম নারীদের কাছে গ্রহণ। যােগ্যতা পায়।

এই আইনে তিন তালাকের সমস্ত ঘােষণা বাতিল ও অবৈধ রূপে বিবেচিত, যার শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা ও তা জামিন অযােগ্য। এই আইনে স্ত্রী খােরপােষ পাওয়ার অধিকারী।

স্ত্রী বিবাহজাত নাবালক বাচ্চাদের হেফাজত পাওয়ার অধিকারী।

নারীদের ক্ষমতায়ন :

এই আইনে অবহেলিত, অশিক্ষিত ও নিরুপায় মেয়েরা যথােচিত আইনি সাহায্য পেতে পারবে, তাদের ভরণপােষণ ও সন্তানদের নিয়ে চিন্তা অনেকটাই দূরীভূত হবে।

মেয়েদের সব সময় তালাকের ভয় দেখিয়ে তাদের বাধ্য রাখার কৌশল বন্ধ হবে—নারীরা পাবে স্বাধিকারের হাতিয়ার। স্বামী দূরে কাজে গিয়ে ফিরে আসেনি, আর একজন মেয়ের সঙ্গে ঘর বেঁধেছেন এই অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মুক্তি পাবে নারীরা।

তালাক প্রাপ্ত মহিলারা যেভাবে সন্তান নিয়ে বাপের বাড়িতে গলগ্রহ হয়ে থাকতেন, তার অবসান হবে, আসবে আত্মমর্যাদাবােধ, উদ্ধার হবে হীনমন্যতা বােধ থেকে আসা হতাশা। বৌকে হেনস্থা করে বা রাগের বশে তালাক দিতে ভয় পাবে পুরুষরা।

উপসংহার :

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন যেমন হয় তেমনি আইনের ফাঁকে সবলেরা বরাবরই উদ্ধার পেয়ে যায়। এজন্য চাই সরকারি সদর্থক ভূমিকা এবং সমস্ত রকমের রাজনীতি সরিয়ে চাই সার্বিক সচেতনতার প্রচার। তাহলেই নারীদের স্বশক্তিকরণ বা ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া দুরূহ হবে না।



error: Content is protected !!