তােমার বিদ্যালয় জীবন, অথবা, আমার বিদ্যালয় জীবন রচনা


তােমার বিদ্যালয় জীবন

ভূমিকা :

বিদ্যালয় জীবন মানুষের সমগ্র জীবনের মধ্যে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। বাবার হাত ধরে প্রথম বিদ্যালয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বর্তমানে সাইকেলে চেপে বিদ্যালয়ে যাওয়া পর্যন্ত যে অধ্যায় তা আমার কাছে বড়ই আনন্দের।

কেননা আমি আমার বিদ্যালয় জীবনকে উপভােগ করতে পেরেছি, ঠিক যেমনটি চেয়েছিলাম, তেমনটি করেই পেয়েছি। অবশ্য সামান্য কিছু অনভিপ্রেত ব্যাপার যে ঘটেনি তা নয়।

কিন্তু সেগুলি আমি ভুলে যেতে চাই। কারণ দুঃখ বা যন্ত্রণাকে জিইয়ে রেখে আমি আমার আনন্দকে মাটি করতে চাই না।

বিদ্যালয়ের গুরুত্ব :

শিশু জন্মাবার পর সে তার শিক্ষার মাধ্যমে হিসেবে পায় পরিবারকে, তারপর বিদ্যালয়কে। পরিবার ও বিদ্যালয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকলে, চিন্তা-চেতনা ও পরিবেশের সামঞ্জস্য থাকলে একটি শিশু জীবনের পর্যায় অতিক্রম করার যে সংকট তা থেকে মুক্ত হতে পারে।

কেননা পরিবার ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও মানসিকতা যদি ভিন্ন হয় তাহলে একজন শিশুর পক্ষে বিদ্যালয়কে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। তখন বিদ্যালয় জীবন সুখের হয় না। অভিভাবকের চাপে বিদ্যালয়ে থাকলেও একজন ছাত্র বিদ্যালয়কে মনের মধ্যে মানিয়ে নিতে পারে না। অথবা স্কুলছুট (Drop out) হতে হয়।

উজ্জ্বল স্মৃতি :

বিদ্যালয়কে অনিচ্ছার সঙ্গে গ্রহণ করা বা বিদ্যালয় থেকে পালিয়ে শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ (১ম পর্ব) উপন্যাসের ইন্দ্রনাথের মতাে হওয়া কোনােটিই আমার জীবনে ঘটেনি, বরং বিদ্যালয় জীবনের স্মৃতি আমার কাছে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে এবং সেই স্মৃতিগুলি আমার জীবনে পাথেয় হয়ে থাকবে।

আসলে বিদ্যালয় জীবনকে যদি শিক্ষাগ্রহণের কাল হিসেবে ধরি, কিম্বা ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতির সময় হিসেবে গণ্য করি, তাহলে বিদ্যালয় জীবন সুখের ও আনন্দের হয়ে উঠতে পারে। বিদ্যালয় জীবন তপস্যা ও সাধনার জীবন, তপস্যার ক্ষেত্র।

এই তপস্যার জন্য চাই সংযম, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা। এছাড়া দেশ ও দশের কল্যাণে আত্মনিয়ােগের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে এই বিদ্যালয় জীবন। শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য যেহেতু মনুষ্যত্বের সর্বাঙ্গীণ উৎকর্ষ সাধন তাই সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে তাদের বাস্তবের মুখােমুখি হতে হয়, তাই বিদ্যালয় জীবন আমার কাছে উজ্জ্বল স্মৃতির স্মারক হয়ে থাকবে।

স্বরূপ :

আমার বিদ্যালয় জীবনের এ পর্যন্ত দুটি অধ্যায়। প্রথম অধ্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রথম অধ্যায়ের স্মৃতি এতটা উজ্জ্বল নয়।

কারণ তখন একটা ভয় আমার মধ্যে ছিল, সকলের সঙ্গে মিশতে পারতাম না, শুধুমাত্র পড়াশােনার মধ্যেই ডুবে থাকতাম, অন্যদের সঙ্গ প্রায় এড়িয়ে চলতাম।

ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্মৃতি আমার কাছে এখন ঝাপসা হয়ে রয়েছে। কিন্তু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যখন ভর্তি হলাম তখন থেকে পরে পরে আমার ভয় কেটে যেতে থাকলাে, সকলের সঙ্গে মিশতে পারলাম, পড়াশােনা ভাল করার জন্য শিক্ষক শিক্ষিকাদের নজরে আসতে পারলাম।

তারা আমার গুণের স্বীকৃতি দেওয়ায় আমার মনােবল আরাে সুদৃঢ় হল। আর কোনাে মানুষ যদি তার ভাল কাজের স্বীকৃতি পায়, তাহলে সে আরাে ভালাে হয়ে উঠতে পারে বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সচেষ্ট হয়।

আবার যখন কিশাের হলাম তখন আমার মধ্যে এল যুক্তিবােধ। যুক্তি দিয়ে হয়তাে তর্ক করেছি, তাতে বকুনি খেয়েছি, কিন্তু কার্যকারণসূত্রকে মনে রেখে যুক্তি দিয়ে বিচার করতে পিছপা হইনি।

কারণ আমি পুরাতন সব কিছুকে নির্বিবাদে মেনে নিতে পারিনি। শুধু তাই নয়, অভিভাবকের বারণ না শুনে আমি বন্ধুদের উপকারের জন্য এগিয়ে গিয়েছি। তখন আমার মন অপরের জন্য কিছু করতে চাইত এবং বাবা ও মা চাইতেন শুধুমাত্র পড়াশােনা নিয়ে থাকি।

ফলে তাঁদের সঙ্গে বিরােধে গিয়েও আমার হৃদয় ও মনকে উন্মুক্ত করে দিতে পেরেছি পরােপকারে। তাই বিদ্যালয়ের বন্ধুদের যে কোনাে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছি এবং তাদের কাছ থেকেও পেয়েছি স্বীকৃতি ও ধন্যবাদ।

বিদ্যালয়ে শিক্ষা বহির্ভূত সহ পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলীতে সর্বত্র এগিয়ে গেছি এবং সেসব ক্ষেত্রে সাফল্য পেয়ে নিজেকে উজ্জীবিত করেছি।

এসব করতে গিয়ে ক্লাসে প্রথম হতে পারিনি ঠিকই এবং তা না হতে পেরে আমার মনে কোনাে হীনমন্যতাও সৃষ্টি হয়নি। কারণ বিদ্যালয়ে কোনাে শ্রেণিতে প্রথম একজনই হবে, কিন্তু শিক্ষা বহির্ভূত মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজেকে শরিক করতে হলে গণ্ডীর বাইরে যেতেই হবে।

তাই ক্লাসে প্রথম না হওয়ার জন্য কোনাে দুঃখ আমার নেই। বরং বন্ধুদের, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যে সাহচর্য ও স্নেহ-ভালবাসা পেয়েছি, তাতে আমার পরবর্তী জীবনের পাথেয় যে তৈরি হয়ে গিয়েছে, তা ভেবে আনন্দ পাই।

উপসংহার :

সুতরাং আত্মসুখ নয়, নিজের কৃতিত্বই বড় নয়, একজন সামাজিক মানুষ হয়ে উঠতে গেলে যে মনুষ্যবৃত্তির প্রয়ােজন হয়, তার আঁতুড় ঘর ছিল আমার বিদ্যালয় জীবন।

আর সে কারণে কী পাইনি তার হিসাব মিলাতে মন রাজি নয়, বরং বিদ্যালয় জীবনে যা আমি পেয়েছি, তা জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলব না।



error: Content is protected !!