তােমার প্রিয় বই, অথবা আমার প্রিয় বই প্রবন্ধ রচনা


তােমার প্রিয় বই

ভূমিকা :

‘আমার আপনার থেকে আপন যে জন, খুঁজে ফিরি তারে আপনার’—এই আপনার হল আমার প্রিয় গ্রন্থ বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’। যার বিষয়বস্তু, চরিত্র, প্রকৃতি-চিত্র আমাকে আকর্ষণ করে। আমি নিজের সত্তার মধ্যে এই গ্রন্থকে মিশিয়ে রেখেছি এবং ‘তারেই আমি খুঁজি’ নানা অবসরে, নিত্য-নৈমিত্তিক একঘেয়েমির বাইরে এবং বর্তমান পরিবেশের অবনমনের কালে।

কেন প্রিয় :

   প্রথমেই প্রশ্ন আসতে পারে, কেন আমি এই গ্রন্থকে প্রিয় বলছি।

তার প্রথম কারণ, প্রিয় বিষয়টি যেহেতু নিজের ভালাে লাগার ব্যাপার, তাই ‘আরণ্যকের বিষয়বস্তুর মধ্যে আমার অন্তরের একটা সাযুজ্য রচিত হয়ে যায়। সেখানে যুক্তি-তর্ক সব কিছু হারিয়ে যায়। যেমন নদী হারিয়ে যায় সমুদ্রে। 

 দ্বিতীয় কারণ, আমি আবাল্য গ্রামে লালিত-পালিত হয়েছি, গ্রামের প্রকৃতির কোল আমার সত্তায় সঞ্জীবিত। তাই আরণ্যক-এর মধ্যে যখন সেই প্রকৃতির সন্ধান পাই তখন আমি আমার সেই গ্রামের প্রকৃতি ও মানুষকে নতুন করে স্মৃতিচারণা করতে পারি এবং নিজেকেও নতুন করে পেতে থাকি।

 তৃতীয় কারণ, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাজসিংহ’, রবীন্দ্রনাথের ‘গােরা’, তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত’ কিম্বা মানিকের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসগুলি আমি পড়েছি। কিন্তু তুলনায় ‘আরণ্যক’কে প্রিয় পছন্দের তালিকায় প্রথমে রেখেছি এই কারণে যে ঃ (ক) বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাজসিংহ’ ঐতিহাসিক উপন্যাস, যেখানে রয়েছে বহু ঘটনার ঘনঘটা—যাতে আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। (খ) আবার রবীন্দ্রনাথের ‘গােরা’ উপন্যাসে যে অখণ্ড ভারত ভাবনা রয়েছে তা আমার কাছে অনেকটা কঠিন বলে মনে হয়।

(গ) তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে বাঁশবাদি গ্রামের কাহার সম্প্রদায়ের যে কথা আছে তা জীবন্ত হলেও লােকসংস্কৃতির যে পরিচয় সেখানে রয়েছে, তা আমার অজানা হওয়ায়, সেইসব বিষয় আমাকে আকর্ষণ করে না। (ঘ) শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত (৪টি পর্ব) বৃহৎ উপন্যাস ও শরৎচন্দ্রের আত্মজীবনী হওয়ায় এর বিচিত্র বিষয় সবসময় আমার মানসিকতার সঙ্গে মেলে (ঙ) আবার মানিকের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ বিখ্যাত আঞ্চলিক উপন্যাস হলেও কিম্বা ধীবরদের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র হলেও আমার কাছে মােহময় হয়ে ওঠে না।

আরণ্যক উপন্যাসের শ্রেণি পরিচয় :

সাধারণভাবে উপন্যাস বলতে যা বােঝায়, আরণ্যক উপন্যাসটি তার থেকে স্বতন্ত্র। একটি বিশেষ পটভূমিকায় কয়েকটি বিশেষ চরিত্রের সুখ-দুঃখ তরঙ্গিত জীবন সু-গ্রথিত প্লটের সাহায্যে একটি জীবনাদর্শের আলােয় ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে একটি উপন্যাসে। আরণ্যক উপন্যাসের পটভূমিকা বিশিষ্ট ও বিশাল, কিন্তু কোনাে সু-গ্রথিত প্লট এই উপন্যাসে নেই। অজস্র চরিত্র আছে কিন্তু কোনাে নায়ক-নায়িকা নেই।

তবে একটি মহৎ জীবনদর্শন আছে। আরও আছে প্রকৃতির প্রতি লেখকের তীব্র আকর্ষণ ও সেই প্রকৃতিতে মানুষগুলি সম্পর্কে অপার মমতা—উপন্যাসটি এই কারণেই বিশিষ্ট এবং আমার এত প্রিয়। প্রকৃতি আলােচ্য উপন্যাসের শুধুমাত্র পটভূমিকাই নয়, একটি প্রধান চরিত্র হিসেবে উপন্যাসটিকে নিয়ন্ত্রিত করেছে। অপরূপ অরণ্য প্রকৃতি, তা-ই এই উপন্যাসের প্রাণ।

মােহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্ট, মহালিখারূপ পর্বতশ্রেণি, কুশী নদী, মিছি নদী, পার্বত্য বন্য কুসুমের তীব্র সুবাস, নিশাচর জানােয়ারের ডাক, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের অপরূপ নির্জন শােভা—সব মিলিয়ে বিপুল ঐশ্বর্যময় প্রকৃতির বৈভব যে কোনাে প্রকৃতিপ্রেমিক পাঠককে আচ্ছন্ন ও অভিভূত করে।

উপন্যাসের চরিত্র :

‘আরণ্যক উপন্যাসের আরও একটি আকর্ষণ, এর অসংখ্য অসহায় মানব-মানবীর জীবন। উপন্যাসটিতে লেখক স্বয়ং একজন চরিত্র। তিনি মােহনপুরার রিজার্ভ ফরেস্টে গিয়েছিলেন ম্যানেজার হয়ে। অরণ্যভূমি কেটে জমিগুলি প্রজাবিলির ব্যবস্থা করাই ছিল তার কাজ। এছাড়া রাজু পাড়ে, গনােরি তেওয়ারি, ধাওতাল সাহু, গণু মাহাততা, কুন্তী, ভানুমতী, মঞ্জী, যুগলপ্রসাদ-এরকম বহু ঘটনাবহুল সাদাসিধে চরিত্র উপন্যাসটির বিভিন্ন পরিচ্ছেদে এসে স্থান করে নিয়েছে।

ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি :

‘আরণ্যক উপন্যাসটির আরও এক সম্পদ এর আন্তরিক বর্ণনাভঙ্গি, সহজ সাবলীল ভাষা এবং প্রসাদগুণ। এক প্রসন্ন জীবনরস উপন্যাসে সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়েছে। কোনাে একটি বিশেষ ভাষাভঙ্গি এই উপন্যাসের ভাষা নয়, এর ভাষা কোথাও জীবনধর্মী, কোথাও আবার প্রকৃতি বর্ণনার ক্ষেত্র অলঙ্কৃত, বর্ণবহুল আবেগে কল্পিত।

উপসংহার :

‘আরণ্যক উপন্যাসটিকে একটি বিশাল ক্যানভাসে অঙ্কিত অরণ্য ও অরণ্যচর মানুষের জীবনচিত্র বলে মনে হয়। পরিচিত প্রাত্যহিক জীবনের পুনরাবৃত্তি থেকে মুক্তির জন্য আমরা মাঝে মাঝে প্রকৃতির কাছে যেতে চাই। সেই প্রার্থিত মুক্তির স্বাদ বহন করে এনেছে উপন্যাসটি।

বর্তমান জীবনের ক্লেদাক্ত পঙ্কিলতা, অন্যায়, বঞ্চনা ও হতাশার কলরােলের মধ্যে দাঁড়িয়ে বিভূতিভূষণের সঙ্গে আমিও উচ্চারণ করি—“…আবার যদি জন্মই হয় তবে যেন ঐ রকম দীনহীনের পর্ণকুটীরে অভাব-অনটনের মধ্যে, পল্লীর স্বচ্ছতােয়া গ্রাম্য নদী, গাছপালা, নিবিড় মাটির গন্ধ, অপূর্ব সন্ধ্যা, মােহভরা দুপুরের মধ্যেই হয়।”

জীবনানন্দ বলেছেন, “আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভাল- বেসে।” আবার জীবনের এই পরম শান্তির পথ ‘আরণ্যকের শিল্পী আমাদের ভাবতে শিখিয়েছেন, “দিগন্তলীন মহালিখারূপের পাহাড় ও মােহনপুরা অরণ্যানীর উদ্দেশ্যে দূর হইতে নমস্কার করিলাম। হে অরণ্যানীর আদিম দেবতা আমায় ক্ষমা করিও, বিদায় আমার বিদায়।”

(অনুসরণে লেখা যায় ? তােমার প্রিয় একটি বাংলা সাহিত্য গ্রন্থ।)



error: Content is protected !!