জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০


জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০

ভূমিকা :

১৯৮৬-র পর ২০২০-তে জাতীয় শিক্ষানীতির বদলের কথা ভেবে কেন্দ্রীয় সরকার মন্ত্রিসভায় ২৯ জুলাই ২০২০ তারিখে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমােদন করেছেন। যার লক্ষ্য হল প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার সঙ্গে বৃত্তিমুখী শিক্ষা (গ্রামীণ ও শহর)কে আরাে দৃঢ়তর করা।

২০১৪-তে বিজেপি যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারই ফলস্বরূপ ২০১৫-তে টি.এস.আর. সুব্রামনিয়ামকে (প্রাক্তন ক্যাবিনেট সেক্রেটারি) খসড়া রচনার ভার দেওয়া হয় ও তিনি ৪৮৪ পৃষ্ঠার খসড়া ২০১৯-এ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পেশ করেন। যা নিয়ে বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত মহলে নানা কারণে তুমুল তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রেক্ষাপট :

আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে এবং বৃত্তিমুখী ও বিজ্ঞানকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে কায়েম করতে কেন্দ্রীয় সরকার যে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন, তারই ফলস্বরূপ নানা ক্ষেত্রের মতাে শিক্ষাক্ষেত্রেও আধুনিকীকরণ করার প্রয়াস করছেন—পার্লামেন্টে সংখ্যাধিক্যের জোরে।

এজন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের নাম বদলে শিক্ষা মন্ত্রক করা হয়েছে—যার দায়িত্বে রমেশ পােখরিয়াল নিশাঙ্ক। সমালােচকের মতে বিজেপি এর দ্বারা শিক্ষাক্ষেত্রকে গৈরিকীকরণ করে নিজেদের লােককে বিভিন্ন পদে বসিয়ে তাদের মাধ্যমে নতুন শিক্ষানীতিকে নিজেদের মতের ও পথের উপযােগী করে প্রচার করার সুযােগ পাবেন।

পরিবর্তনের ক্ষেত্র :

নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির যে ক্ষেত্রগুলির সংস্কার-এর কথা ভাবা হয়েছে সেগুলি হল :

(১) জিডিপি-র ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে খরচ করা হবে, যা বর্তমানে ১.৭ শতাংশ।

(২) ৬ থেকে ১৪ বছরের বদলে ৩ থেকে ১৮ বছরের বাচ্চাদের বাধ্যতামূলক শিক্ষার মধ্যে আনা হবে।

(৩) ১৮ বছর পর্যন্ত বাচ্চাদের শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নয়, শিক্ষার অধিকার-এর আওতায় আনা হবে। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা বিশেষ অগ্রাধিকার পাবে।

(৪) শিক্ষার জন্য তৈরি হবে রাষ্ট্রীয় শিক্ষা আয়ােগ যার প্রধান হবেন প্রধানমন্ত্রী।

(৫) বিদেশের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১০০টি কলেজকে এদেশে তাদের ক্যাম্পাস গড়ার অনুমােদন দেওয়া হবে।

(৬) ডিজিটাল শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে National Educational Technology Forum তৈরি করা হবে এবং E-কোর্স প্রাথমিকভাবে ৮টি আঞ্চলিক ভাষায় প্রকাশ করা হবে।

(৭) কস্তুরবা গান্ধী স্কুলগুলিকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা হবে।

(৮) ই-লার্নিং-এ জোর দেওয়া হবে। ৮টি ভাষায় আপাতত অনলাইনে পড়াশােনা চলবে।

(৯) ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, দর্শন, শিল্প, নৃত্য, থিয়েটার, গণিত, পরিসংখ্যান, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ক্রীড়া প্রভৃতি বিভাগে উচ্চশিক্ষাকে প্রতিষ্ঠিত ও জোরদার করা হবে প্রতিষ্ঠানগুলিতে।

বিদ্যালয় শিক্ষা :

উপরিউক্ত সাধারণ পরিবর্তন ছাড়া স্কুলস্তরে যে পরিবর্তনগুলি জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রবর্তিত হতে চলেছে, তা হল—(১) বিদ্যালয় শিক্ষাকে ১০+২-এর পরিবর্তে ৫+৩+৩+৪ এই আদলে সাজানাে হয়েছে। ৩ বছরের প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সাথে দশম শ্রেণির পরীক্ষাব্যবস্থা অবলুপ্ত করে ৯-১২ ক্লাস পর্যন্ত একটা অভিন্ন ৮ সেমেস্টারের সিস্টেম আসতে চলেছে—যা ওপেন স্কুলেও থাকবে।

তিন বছর প্রাক্ প্রাথমিক দুই বছর প্রাথমিক (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) ৮ বছর বয়স পর্যন্ত, তারপর তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি (৮-১১), ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি (১১-১৪), নবম থেকে দ্বাদশ (১৪-১৮ বছর বয়স)। (২) পৃথকভাবে কলা, বিজ্ঞান, বাণিজ্য বিভাগ না রেখে সুবিধামতাে শিক্ষার্থী যে কোন বিষয় গ্রহণ করতে পারবে।

(৩) ২০২৫ সাল নাগাদ সব রাজ্য ও কেন্দ্রের বিদ্যালয়কে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। (৪) ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যাতে ৫০ শতাংশ বিদ্যালয়কে প্রশিক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। (৫) ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কোডিং শেখানাে, বৃত্তিমূলক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

(৬) মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ত্রিস্তরীয়—(নিজেরা, সহপাঠীর ও শিক্ষক শিক্ষিকারা) ব্যবস্থা থাকবে। (৭) বাের্ড পরীক্ষায় বড় ও ছােট প্রশ্ন থাকবে। (৮) প্রথম শ্রেণির শিশুদের ক্ষেত্রে প্রথম তিন মাস খেলাভিত্তিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। (৯) শিক্ষার লক্ষ্য হবে শুধু জ্ঞান অর্জন নয় বরং তা চরিত্র গঠন ও সার্বিক বিকাশের উপযােগী।

(১০) ন্যূনতম পঞম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষা বা স্থানীয় ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। (১১) দিব্যাঙ্গ শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে বিশেষ ব্যবস্থা। (১২) স্বাক্ষরতা, প্রাথমিক শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষণ, জটিল জীবনশৈলী বিষয়ে শিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। (১৩) সংস্কৃত ভাষাকে বিদ্যালয় স্তরে গুরুত্ব দিতে হবে।

উচ্চশিক্ষা :

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে যে সুপারিশগুলি গৃহীত হয়েছে, তা হল : (১) ২০৪০ সাল নাগাদ সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে মাল্টিডিসিপ্লিনারি করতে হবে এবং ন্যূনতম ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা হবে ৩০০০ এবং প্রতি জেলায় অন্তত একটি করে এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। (২) মূল্যায়নের গ্রেড অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে।

(৩) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অনলাইন প্রােগ্রাম ও দূরশিক্ষার ব্যবস্থা (DDL) থাকবে। (৪) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সমাজসেবা; পরিবেশ বিদ্যা, নীতিশিক্ষা প্রভৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেবে ও ক্রেডিট বেসড স্কোরিং চালু করবে। (৫) কলেজে ভর্তির জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা থাকবে, কোনাে কলেজ না চাইলে চালু নাও করতে পারে।

(৬) স্নাতক কোর্স ৩/৪ বছরের, স্নাতকোত্তর কোর্স ১/২ বছরের এবং ইন্টিগ্রেটেড কোর্স ৫ বছরের হবে। (৭) উচ্চশিক্ষায় এন্ট্রি ও এক্সিট-এ অনেক স্বাধীনতা থাকছে সেই অনুযায়ী সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। (৮) এম ফিল কোর্স থাকছে না। (৯) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইকো ক্লাব, স্পাের্টস ক্লাস, সংস্কৃতি ও কলা কেন্দ্রসহ নানা ভারমুক্ত বিষয়ের সুযােগ থাকবে।

(১০) ছাত্রাবাস ও ন্যূনতম চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযােগ থাকবে।(১১) সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এক ছাতার তলায় এনে Higher Education Commission of India গঠিত হবে—যার অধীনে থাকবে—NHERC, NAC, HEGC, GEC। (১২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লাভজনক ক্ষেত্র হবে না। (১৩) প্রযুক্তিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগাতে Indian Institute of Translation and Interpretation (IITI) গড়ে তােলা হবে।

অন্যান্য :

এছাড়া (১) সহশিক্ষক/প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকাদের নিজেদের উদ্যোগে প্রতিবছর ৫০ ঘন্টার Continuous Professional Development (CPD)-এ অংশগ্রহণ করতে বলা হয়েছে। (২) ২০২১ সাল নাগাদ NCTE ও NCERT-র যৌথ উদ্যোগে NCFTE প্রকাশ পাবে।

(৩) ২০৩০ সাল নাগাদ সাধারণ ডিগ্রি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হবে। (৪) চার বছরের ইন্ট্রিগ্রেটেড গ্র্যাজুয়েশন ও বি. এড. এবং গ্র্যাজুয়েটদের দু বছরের বি. এড, চালু হবে। স্নাতকোত্তরদের ১ বছরের বি. এড. কোর্স হবে।

(৫) শিক্ষায় প্রযুক্তি, ডিজিট্যাল লাইব্রেরি ও ভার্চুয়াল ল্যাব-এর ব্যবস্থা থাকবে। (৬) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও ছাত্রছাত্রীদের অগ্রগতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে টেকনােলজির ব্যবহার করা হবে।

উপসংহার :

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজ্যের সঙ্গে আলােচনা করে বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত সমাজের মতামত নিয়ে সমন্বয় ও সহমতের ভিত্তিতে, স্থানীয় চাহিদার কথা ও পরিকাঠামাের কথা ভেবে এবং ভাষাগত দিকের কথা চিন্তা করে আগামীদিনে এই শিক্ষানীতি প্রবর্তিত হলে সকলের পক্ষেই কল্যাণকর হবে।

শুধু বদলের জন্য বদল নয় কিম্বা উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য পরিবর্তন নয়, বরং যুগের চাহিদা ও ছাত্রছাত্রীদের কথা মাথায় রেখে আমাদের দেশের ভৌগােলিক অবস্থান ও সুযােগ-সুবিধার কথা ভেবে, আগামীদিনের শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনমুখী ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত করতে শিক্ষানীতি চালু হােক—এই প্রত্যাশা করতেই পারি।



error: Content is protected !!