জলসংরক্ষণ ও সমস্যা ও সম্ভাবনা


জলসংরক্ষণ ও সমস্যা ও সম্ভাবনা

ভূমিকা :

আধুনিক জীবন চলছে দ্রুতগতিতে ক্রমবর্ধমান নগরায়ন ও বিশ্বায়নের চাকায় ভর করে। যে জলের দ্বারা সভ্যতার উদ্গমন হয়েছিল, যে জল-কে কেন্দ্র করে জীবন ও জীবিকার বর্ধন সম্ভব হয়েছিল, সেই জলের অভাব আগামী প্রজন্ম-কে ভাবাচ্ছে।

পৃথিবীতে তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল হলেও, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব প্রকট হয়ে উঠছে—ভূগর্ভস্থ জল নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার জন্য এবং প্রাকৃতিক জলকে যথাযথভাবে ব্যবহার করার সদিচ্ছা ও সচেতনতার অভাবের জন্য।

তাই জলের ব্যবহার ও জলসংরক্ষণের কথা আজ-ই না ভাবলে আগামী প্রজন্মকে তার ফলভােগ করতেই হবে—শিশুর বাসযােগ্য হবে না এই পৃথিবী।

উদ্দেশ্য :

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভবিষ্যতের কথা ভেবে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মানুষের চাহিদা মেটাতে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক সম্পদ বিশুদ্ধ জলের পরিমাণ বজায় রাখতে জলসংরক্ষণের বিভিন্ন নীতি ও কৌশল গ্রহণ করেছে। জলসংরক্ষণের উদ্দেশ্য হল ঃ

(ক) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিশুদ্ধ জলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা,

(খ) জলকে শক্তিরূপে গণ্য করে তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ,

(গ) বিশুদ্ধ জলের উৎসগুলিকে সংরক্ষণ করে, মানুষের জল ব্যবহারের অপচয় কমিয়ে, কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহার কমিয়ে আনা।

জিলসংরক্ষণের উপায় :

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘জল ধরাে জল ভরাে’ প্রকল্পের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে—যার দ্বারা গ্রামাঞ্চলে ও শহরে নানা প্রকল্প ও প্রচার ইতিমধ্যে সাড়া জাগিয়েছে।

এর জন্য পুকুর ও জলাশয় খনন করে বৃষ্টির জল ধরে রেখে জলাশয় বিস্তার করা, বৃষ্টির জল ধরতে নালা তৈরি করে পরিস্রাবণ পদ্ধতিতে জল ধরে রাখার কৌশল। গ্রহণ করা হয়েছে—যার দ্বারা কৃষিকাজে, বাগানের প্রয়ােজনে জলকে ব্যবহার করা যাবে।

দীর্ঘদিন ধরে জল চুইয়ে চুইয়ে তা মাটির নীচে প্রবেশ করে। সেই জলেরও দূষণ হচ্ছে স্টোরেজ ট্যাংক, সেপটিক সিস্টেম, বিপজ্জনক বর্জ্যের মাধ্যমে। এজন্য এগুলির যথাযথ ব্যবস্থাপনা প্রয়ােজন।

আর প্রয়ােজন জলসংরক্ষণ কৌশলের একটি মৌলিক উপাদান জলসংরক্ষণের উপযােগিতার বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

প্রযুক্তিগত দিক

(ক) প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঝরনার জলকে সংরক্ষণ করা। (খ) বাড়িতে শৌচালয়ে কম জল লাগে এমন ফ্লাশ ব্যবহার করা। (গ) পানীয় জলের ট্যাপ থেকে নির্গত জলের ব্যবহারে প্রযুক্তি ব্যবহার।

(ঘ) বর্জ্য জলকে ব্যবহারযােগ্য করা বা নবীকরণ করা। (ঙ) বহুতল বাড়িতে ছাদের জল পাইপের মাধ্যমে ভূগর্ভে পাঠানাে। (চ) বৃষ্টির জলকে সংরক্ষণ করা। (ছ) উচ্চ দক্ষতার কাপড় ধােয়ার মেশিন ব্যবহার করা। (জ) গাড়ি ধােয়ার কাজে জল ব্যবহার না করা। (ঝ) রাস্তা পরিষ্কারের জন্য জলের ব্যবহারের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ।

(ঞ) হাসপাতালে জলসংরক্ষণের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার। (ট) কৃষিকাজে ওভারহেড সেচ ও ন্যূনতম জল ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। (ঠ) বৃষ্টির জলকে মাটির নীচে ধরে রেখে চাষআবাদ করার নতুন নতুন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা যেতে পারে। (ড) সমুদ্রের লবণাক্ত জলকে। মুক্ত করতে সমুদ্রপৃষ্ঠে উদ্ভিদ লাগানাে।

(ঢ) বালি পরিস্রাবণের মাধ্যমে জল বিশুদ্ধ করা যেতে পারে—যে পদ্ধতিতে জীবাণু অপসারিত হতে পারে। (ণ) সর্বোপরি জলের অপচয় রুখতে মানুষকে সচেতন করা। কারণ ভূগর্ভস্থ স্বাদুজল মাত্র ৩০ শতাংশ।

বৃষ্টির জলসংরক্ষণ :

বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করতে পারলে তা যেমন খরার সময় জল প্রবাহকে বজায় খতে পারবে তেমনি নীচু এলাকাকে বন্যা থেকেও বাঁচানাে যাবে। বৃষ্টির জলকে ট্যাংকে ধরে রেখে তাকে পরিশােধন করে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বৃষ্টির জল আহরণের জন্য জিআইএস ম্যাপ ব্যবহার করে সেই এলাকাকে চিহ্নিত করা। Rain is gain যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে কোন এলাকায় জলের চাহিদা কত তা জেনে নিয়ে সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

বৃষ্টির জলকে শৌচাগারের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। সৌর প্যানেল-এর মাধ্যমে বৃষ্টির জলসংরক্ষণ করা যায়।

উপসংহার :

মানুষের সচেতনতা ও সাবধানতা-ই জলসংরক্ষণ সম্ভাবনার প্রধান উপায়। প্রাকৃতিক শক্তির ব্যবহার এবং ব্যবহৃত শক্তির পুনর্নবীকরণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জলসংরক্ষণের যেসব উপায় রয়েছে তার যথাযথ সুষ্ঠু ও আশু ব্যবহার এই মুহূর্তে একান্ত জরুরি।

আমরা যদি উপলব্ধি করি তেল ও জল দুই-ই সমান মহার্ঘ, তাহলে তেলসংরক্ষণের মতাে জলসংরক্ষণ করার কথা ভাবতে পারি। আর সেই ভাবনা ও ভাবনার যথাযথ রূপায়ণ-ই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে।



error: Content is protected !!