জন্ম শতবর্ষে পদাতিক কবি সুভাষ মুখােপাধ্যায়


জন্ম শতবর্ষে পদাতিক কবি সুভাষ মুখােপাধ্যায়

ভূমিকা :

রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার অঙ্গনে সুভাষ মুখােপাধ্যায় এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তার মৃত্যুর পর আজও তিনি অতীত নন, বর্তমান। কেননা তার কবিতা হাজার জনের দিকে মেলে দেওয়া ভালােবাসারই তীব্র সংগ্রামের কাব্য।

তিনি তার হৃদয়কে মেলে ধরেছিলেন বৃহত্তর মানব সমাজের দিকে, যেখানে নিয়ত দুঃখ ও সংঘর্ষের বেদনায় জন্ম নিচ্ছে আগামীকালের ইতিহাস। তাঁর কবিতার সমস্ত মাধুর্য যেন নিহিত আছে তার অভিজ্ঞতার আহরণ ও প্রকাশ বেদনার আন্তরিকতায়।

বস্তুত এই আন্তরিকতার ঐশ্বর্যেই সুভাষ মুখােপাধ্যায় একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদকে অবলম্বন করেও কবিতাকে সার্থক ও রসােত্তীর্ণ মূর্তি দান করতে পেরেছেন। তাঁর কবিতা আমাদের কাছে প্রেরণা ও উৎসাহের বাণী।

ব্যক্তি জীবন :

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারি, নদীয়ার কৃয়নগরে মাতুলালয়ে কবি সুভাষ মুখােপাধ্যায়ের জন্ম। পিতা ক্ষিতিশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়, মা যামিনী দেবী। পিতার আবগারী বিভাগে বদলির চাকরি হওয়ায় কবির শৈশব কাটে বিভিন্ন স্থানে।

কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশান থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। কবি ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ১৯৩২-৩৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিশাের ছাত্রদল’-এ যুক্ত হন। ১৯৩৯-এ যুক্ত হন লেবার পার্টির সঙ্গে।

১৯৪২-এ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৬-এ দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকার সাংবাদিক হয়ে আসেন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি গােষিত হলে তিনি কারাবরণ করেন এবং ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর কারামুক্তি ঘটে।

জেল ফেরৎ কবির জীবনে আর্থিক দুরবস্থা দেখা দিলে মাত্র পঁচাত্তর টাকা বেতনে একটি নতুন প্রকাশনা সংস্থার সাব-এডিটর হন। ১৯৫১-এ ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। এই বছরই গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার বিবাহ হয়।

১৯৬৭তে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার কারণে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে তিনি দ্বিতীয়বার কারাবরণ করেন এবং তেরােদিন কারারুদ্ধ থাকেন।

১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে পার্টির সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি নেন এবং তারপর বামপন্থী রাজনীতি পরিত্যাগ করে দক্ষিণপন্থী পার্টি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমর্থন করলে তিনি হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্র। মৃত্যুর দিনেও সেই বিতর্ক থেকে গিয়েছিল।

রচনা সমূহ :

তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’ (১৯৪০)। তিনি কাব্য, অনুবাদ কাব্য, ছড়া, ভ্রমণ কাহিনি, উপন্যাস, জীবনী প্রভৃতি রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযােগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল—‘অগ্নিকোণ’, ‘চিরকূট’, যত দূরেই যাই’, ‘কাল মধুমাস’, ‘ছেলে গেছে বনে’, ‘একটু পা চালিয়ে ভাই’, ‘বাঘ ডেকেছিল’, ‘ধর্মের কল’ ইত্যাদি।

তার রচিত ভ্রমণ কাহিনির মধ্যে অন্যতম হল—“যখন যেখানে’, ‘ডাক বাংলার ডায়রি’, ‘ক্ষমা নেই’, ‘খােলা হাতে খােলা মনে’ ইত্যাদি। তাঁর রচিত উপন্যাস হল—হংসরাজ’, ‘কে কোথায় যায়। তিনি ‘জগদীশচন্দ্র’ নামে জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। শিশু ও কিশােরদের জন্য রচনা করেছেন দেশবিদেশের রূপকথা’, বাংলা সাহিত্যের সেকাল ও একাল’, ‘ইয়াসিনের কলকাতা ইত্যাদি।

কবিসত্তর বৈশিষ্ট্য :

সুভাষ মুখােপাধ্যায় বােধহয় প্রথম বাঙালি কবি যিনি প্রেমের কবিতা বা প্রকৃতিবিষয়ক কবিতা লিখে কাব্যজীবন আরম্ভ করলেন না।

পদাতিক’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘সে দিনের কবিতা’ তে তাই তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গর্জনশীল বিষণার নিচে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করলেন—“প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ধ্বংসের মুখােমুখি আমরা,/ চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য/কাট ফাটা রােদ সেঁকে চামড়া।”

দ্বিতীয়ত, রাজনীতি ও কবিতাকে তিনি পৃথক করে দেখেননি। তিনি নিজেই বলেছেন—“রাজনীতির সত্তা আমার কবিতার সত্তা থেকে পৃথক নয়। রাজনীতি ছােট জিনিস নয়। তাকে যখন ছােট করে দেখি, তখনই আমরা ছােট হয়ে যাই।”

তাই পদাতিক কাব্যগ্রন্থের ‘রােমান্টিক কবিতায় তিনি লিখলেন—“ছেড়া জুতােটার ফিতেটা বাঁধতে বাঁধতে/বেঁধে নিই মন কাব্যের প্রতিপক্ষে/সেই কথাটাই বাধে না নিজেকে বলতে/শুনবে যে কথা হাজার জনকে বলতে।”

তাই প্রথম থেকেই মার্কসবাদী কবি শতাব্দী লাঞ্ছিত আর্তের কান্না দূর করার ব্রত নিয়েছেন। তাই ডাক দিয়েছেন সবাইকে সংসারের অনিবার্য লড়াইয়ের প্রাঙ্গণে—

মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা আর না—

পরাে পরাে যুদ্ধের সজ্জা।

তৃতীয়ত, আবেগের সঙ্গে বহির্বিশ্বের অপরূপ সমন্বয়ে সুভাষের ‘ চিরকুট’ কাব্যটি উজ্জ্বল। এখানে কবি অভিজ্ঞতায় অনেক সুস্থির, বিশ্বাসের দীপ্তিতে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর কখনও বিদ্রুপে ব্যঙ্গে তীক্ষ্ণ, কখনও বা আবেগে ব্যথায় বিধুর।

তাই এগিয়ে চলার গান বিপ্লবের সম্ভাবনায় সংহত হয়—“দিগন্তে দিগন্তে দেখি/বিস্ফারিত আসন্ন বিপ্লব।” শ্লেষে, বিদ্রুপে ও উদ্দীপনায় তাঁর কবিতায় উজ্জ্বল শাণিত দীপ্তি।

মন্বন্তরের মুখােমুখি দাঁড়িয়ে লিখলেন ‘ চিরকূট’ কবিতা—“পেট জ্বলছে, ক্ষেত জ্বলছে/হুজুর, জেনে রাখুন/খাজনা এবার মাপ না হলে/জ্বলে উঠবে আগুন।

চতুর্থত, ‘মিছিলের মুখ’ কবির প্রথম প্রেমের কবিতা। মিছিলের সেই মুখ কোন নরম নায়িকার মতাে ঢলােঢলাে লাবণ্যে ভরা ছিল না, ছিল না তার কোন মেদুর আকর্ষণ—“মিছিলে দেখেছিলাম একটি মুখ/মুষ্টিবদ্ধ একটি শাণিত হাত/আকাশের দিকে নিক্ষিপ্ত;/বিশ্বস্ত কয়েকটি কেশাগ্র/আগুনের শিখার মতাে হাওয়ায় কম্পমান।”

আসলে সুভাষ মুখােপাধ্যায় প্রেমকে চিনলেন পৃথিবীর শৃঙ্খলামুক্ত ভালােবাসার সহযােগীরূপে। পঞ্চমত, বাংলা কাব্যে তার অসাধারণ প্রসিদ্ধির অন্যতম কারণ তাঁর কবিতার অসাধারণ আঙ্গিক সিদ্ধি।

শব্দচয়নে তার অনায়াস সিদ্ধি ছিল লক্ষণীয়। যেমন—এক হলে পারি, একা হলে হারি। কিম্বা, ‘যে ভাগে সে ভাঙ্গে/যে লড়ে সে গড়ে’ ইত্যাদি পুরাণ প্রসঙ্গের উত্থাপনায়ও তার কৃতিত্ব যথেষ্ট।

যেমন শকুনি রণচণ্ডী’, ‘কুম্ভকর্ণ-দধীচির হাড়’ প্রভৃতি বিভিন্ন পুরাণ প্রতিমায় তার কাব্য সুসজ্জিত। সাত ভাই চম্পা’র প্রসঙ্গ এনেছেন রুপকথার আর্কেটাইপে। কবিতার মধ্যে নাটকীয়তা ও গল্পময়তা এনেছেন কবি। ছন্দের ক্ষেত্রে স্তবক বিন্যাসে নতুনত্ব এনেছেন কবি।

মতাদর্শ :

প্রথম জীবন থেকেই কবি কমিউনিজমে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কমিউনিজমের মাধ্যমে মানুষের মুক্তি আসবে। তিনি মনে করতেন-‘মানবতা ও দেশাত্মবােধ থেকে রাজনীতি পৃথক নয়।

তাই আকাশের চাদ তাকে হাতছানি দিতে পারেনি কারণ ‘ওসব কেবল বুর্জোয়াদের মায়া। সাধারণ মানুষের কথা ভেবেছেন, ভেবেছেন কৃষক শ্রমিকের কথা। তার বলিষ্ঠ ও সাহসী মতাদর্শ তাকে পথ চলার প্রেরণা দান করেছিল।

তাঁর সাহিত্যিক মতাদর্শ সম্বন্ধে তিনি জানিয়েছেন—“সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে জীবন প্রতিফলিত। তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে—যা কিছু সংঘাত সংগ্রাম আর প্রেরণা, জয়-পরাজয় আর জীবনের ভালােবাসা-খুঁজে পাওয়া যাবে একটি মানুষের সব কটি দিক।”

উপসংহার :

সুভাষ মুখােপাধ্যায় এমন একজন মানুষ যিনি নিজের মতাে করে জগৎটাকে উপলব্বি করেছিলেন এবং সে ভাবেই আমৃত্যু পথ চলেছেন পদাতিক কবি।

এক বলিষ্ঠ প্রত্যয় ও সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে পথ চলতে সাহায্য করেছিল এবং একারণে তিনি অন্য অনেক সহযাত্রীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তার মৃত্যু তাই আমাদের কাছে নতুন করে তাকে পাওয়া।

তার আদর্শ ও বলিষ্ঠ প্রত্যয়কে নিজেদের অন্তরে উপলব্ধি করে নিজেদেরকে দেউলিয়াপনা থেকে মুক্ত করার তাগিদ অনুভব করা। কারণ তিনি জানতেন—

ফুলকে দিয়ে

মানুষ বড় বেশি মিথ্যে বলায় বলেই

ফুলের ওপর কোনদিনই আমার টান নেই।

তার চেয়ে আমার পছন্দ

আগুনের ফুলকি—

যা দিয়ে কোনদিন কারাে মুখােশ হয় না।

(পাথরের ফুল)

জীবনশিল্পী সুভাষ মুখােপাধ্যায় কোনদিন মুখােশ পরেন নি। সেই তার অহংকার। আমাদের মুখােশ পরা সমাজে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে হলে মুখােশটা তাই খুলে রাখতেই হবে।

অনুসরণে লেখা যায় ঃ একজন বিশিষ্ট আধুনিক কবি।



error: Content is protected !!