জন্ম শতবর্ষে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


জন্ম শতবর্ষে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

ভূমিকা :

মানবতাবাদী সাম্যবাদী আধুনিক কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিশ শতকের চল্লিশের দশকের উল্লেখযােগ্য কবি। তাঁর কবিতার কেন্দ্রে আছে মানুষ ও স্বদেশ।

তিনি সমকালীন জীবনের প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়কে উপলব্ধি করে, নগর সভ্যতার মূল্যবােধের অবক্ষয় লক্ষ করে মানুষ ও স্বদেশকে রক্ষার ইচ্ছায় কলম ধরেছিলেন।

তাই তার প্রতিবাদী চেতনার স্বরুপ কাব্যের মধ্যে সহজ সুরে সাবলীল ভাবে ধ্বনিত হয়েছে। বর্তমানে তার জন্ম শতবর্ষে তার শিল্পী সত্তার বিভিন্ন দিককে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার আয়ােজন হয়েছে।

জীবন ও শিক্ষা :

১৯২০ সালের ২রা সেপ্টেম্বর অধুনা বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার বেজগাঁও গ্রামে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন। পরে তারা কলকাতায় চলে আসেন ও স্কুলে পড়বার সময় অনুশীলন দলের দলের সঙ্গে যুক্ত হন।

এরপর তিনি বামপন্থী মতবাদ ও বামপন্থীদের বিভিন্ন কর্মে নিজেকে যুক্ত করেন। রিপন কলেজে পড়ার সময় অধ্যাপক হিসেবে তিনি বুদ্ধদেব বসু ও বিষ্ণু দে-কে পেয়েছেন। এই রিপন কলেজেই তার প্রথম কবিতা (১৯৩৯-৪০) প্রকাশিত হয়। তিনি মনে করতেন

সাধারণ মানুষের কথা ভেবে রাজনীতি সরল ও স্পষ্ট হওয়া উচিত। বাংলার দুর্ভিক্ষ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তিনি আলােড়িত হন ও তার মধ্যে সমাজতন্ত্রী ভাবধারার বিকাশ ঘটতে থাকে।

১৯৪৯-এ ‘গণবার্তা এবং ক্রান্তি’ পত্রিকার সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। তিনি অরণি’, ‘অগ্রণী’, কবিতা’, ‘পূর্বাশা’, বসুমতী’ প্রভৃতি পত্রিকায় কলম ধরেছিলেন।

শিল্পীসত্তা :

সমাজকে সাম্যবাদী দৃষ্টিতে দেখেছেন কবি। সেজন্য তার কবিতায় শােষিত, পীড়িত মানুষের দুর্গতির জন্য ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে—কবি সুকান্তের মতাে।

রবীন্দ্রনাথ যেমন ‘ওরা কাজ করে কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের বন্দনা করেছিলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর কবিতায় দেশের শ্রমশক্তির জয় ঘােষণা করেছেন।

তিনি সমকালীন জীবনে রাষ্ট্রীয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র শ্রেণি শােষণের যন্ত্র সেখানে বহু মানুষ অন্নহীন, বস্ত্রহীন ও আশ্রয়হীন হবে।

এমনকি বাংলার খাদ্য আন্দোলনের সময় কবি নিরন্ন মানুষের কান্না প্রত্যক্ষ করেছেন এবং এজন্য সরকারি অত্যাচারকে কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই তাঁর কবিতায় সমকালীন জীবন, স্বদেশ, অবহেলিত মানুষ প্রতিবাদী সুরে ধ্বনিত হয়েছে।

কাব্যগ্রন্থ :

তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘গ্রহচ্যুত’ প্রকাশিত হয় ১৯৪২-এ। তার শেষ কাব্যগ্রন্থ অথচ ভারতবর্ষ ওদের’ ১৯৮৪-তে প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যতম কাব্য- গ্রন্থগুলি হল ও রাণুর জন্য’, ‘উলুখড়ের দুয়ার’, রাস্তায় যে হেঁটে যায়’, ‘মানুষ খেকো বাঘেরা বড় লাফায়’, ভিয়েতনাম ঃ ভারতবর্ষ’, ‘ভাতে পড়ল মাছি’, ‘আমার যজ্ঞের ঘােড়া’ প্রভৃতি।

কবির বৈশিষ্ট্য :

কবি যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে বেশি করে উপলব্ধি করেছেন মানুষের ক্ষুধাকে। তাই তিনি লিখেছেন, ‘আশ্চর্য ভাতের গন্ধ, রাত্রির আকাশে। কারা যেন আজো ভাত রাঁধে। ভাত বাড়ে ভাত খায়।

প্রেমহীন সময়কে উপলব্ধি করেছেন কবি—‘প্রেম? সে যে একেবারে কঁকি!/হাসি পায়, একদিন ছিলে তুমি, আজো আছ নাকি?’ দেশবিভাগজনিত কারণে উদ্বাস্তুদের কথা ভেবে লিখেছেন—“রুটি যখন অনেক দূর, নীল আকাশের চাঁদ/সােনা, তুই জন্মালি এই দেশে।/ওরে মাণিক, পরাণ ভরে রুটির জন্য কাঁদে।

আমার ভারতবর্ষ কবিতায় কবি শােষিত মানুষের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে শােষকদের বাদ দিয়ে নতুন ভারতবর্ষ গড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন—“আমার ভারতবর্ষপঞ্চাশ কোটি নগ্ন মানুষের/যারা সারাদিন রৌদ্রে খাটে, সারারাত ঘুমুতে পারে না/ক্ষুধার জ্বালায়, শীতে। আধুনিক সভ্যতার করালরূপ কবিকে ব্যথিত করে।

তাই যুদ্ধের বিরুদ্ধে’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘চলাে আমরা চাঁদের দেশে যাই/চলাে আমরা সময় থাকতে যে যার দেশের জাতীয় পতাকা/চাঁদের দেশের সবার চাইতে উঁচু পাহাড়টার/চুড়ায় দিই উড়িয়ে, তার মাটিকে করি সােনার চেয়ে দামী।

কবি সাধারণ শােষিত মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চেয়েছেন, ‘একটা পৃথিবী চাই/শুকনাে কাঠের মত মায়েদের/শরীরে কান্না নিয়ে নয়/তাদের বুক ভর্তি অফুরন্ত ভালােবাসার/ শস্য নিয়ে।

প্রকৃতি যে মানুষের সঙ্গী তা নিয়ে লিখেছেন, চাদের আলােয় গাছেদের সভা, বসন্তের উদ্দাম হাওয়ায়/মন কোথা চলে যায় বলে/মনকে আগলায় সভা করে।

কৃতিত্ব :

বিষয়বস্তুর নির্বাচনে, সমকালীন জীবনের মূল সমস্যার উপস্থাপনে তাঁর কৃতিত্ব যথেষ্ট। সমস্যা’ কবিতাও কাব্যমূল্যে অতুলনীয়। যেমন, রাত্রি ভাের হয়/পদ্মের পাতায় জলে মন্ত্রগুলি/অবাক ভােরের পাখি/আর/ আগুনের রঙে রাঙা মানুষের শােক জন্মভূমি/ তাের পায়ে মাথা রাখতে সাধ হয়।

মানবদরদী কবি নিরন্ন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে, রাষ্ট্রশক্তির ভণ্ডামিকে মেলে ধরতে, দেশের কল্যাণের জন্য কলম ধরেছিলেন। ভাব ও ভাষার মেলবন্ধনে সেই কবিতা তাই পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

উপসংহার :

প্রতিবাদী চেতনার অভাব আজকের দিনে সর্বত্র। দেশ-কাল-রাষ্ট্র বড্ড বেশি সংকটে এবং এর কারণ এক কৃত্রিম বস্তুবাদী জীবনের প্রতি আকর্ষণ। সেক্ষেত্রে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলম ধরেছিলেন সাধারণ নিরন্ন মানুষের জন্য, রাষ্ট্রশক্তির শােষণের বিরুদ্ধে, দেশ তার কাছে ছিল পবিত্র এক আশ্রয়। সব মিলে তার কবিতার ভাব ও শিল্পীসত্তা আজকের দিনেও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।



error: Content is protected !!