চন্দ্রযান ২ প্রবন্ধ রচনা : চন্দ্রযান ২ মহাকাশ গবেষণার নতুন দিগন্ত

চন্দ্রযান-২ : মহাকাশ গবেষণার নতুন দিগন্ত

ভূমিকা:

আয় আয় চাঁদ মামা টি দিয়ে যা’—ছেলে ভুলানাে ছড়া-র চাঁদমামা আজ বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে নতুন দিগন্তের সূচক হতে চলেছে। কেননা ভারতীয় মহাকাশ গবেষণায় অতি সম্প্রতি এক অভিনব মাইলফলক হল চন্দ্রযান-২, যার সফল উৎক্ষেপণ হল ২২ জুলাই ২০১৯ তারিখে ২টা ৪৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড সময়ে। ইসরাে দ্বারা পরিচালিত এই অভিযানে চন্দ্রযান-২ একটি ভূস্থিত উপগ্রহ উৎক্ষেপণ যান মার্ক ৩ দ্বারা চাঁদে পাঠানাের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ চন্দ্রযান-এর ল্যান্ডার চাঁদের মাটিতে নামার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যান্ত্রিক গােলযােগে ল্যান্ডার থেকে বিক্রম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে চন্দ্রযান-২-এর আংশিক সাফল্য যে গর্বিত করবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কারণ চন্দ্রযান-এর অরবিটর এখনও সক্রিয় রয়েছে বলেই বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন।

চন্দ্রযান-১

এর আগে চন্দ্রযান-১ এর সফল অভিযান হয়েছিল ২২ অক্টোবর, ২০০৮ এবং ১৪ নভেম্বর রাত ৮টা ৬ মিনিটে মুন ইমপ্যাক্ট পােবটি চাঁদের কক্ষপথে ভ্রাম্যমান চন্দ্রযান থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফল ও পন্থায় অবতরণ করে। চাঁদের মাটিতে জলের উপস্থিতি পরীক্ষা করে দেখার ক্ষেত্রে এই অভিযান ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।

চন্দ্রযান-২

ইসরাের তথ্য অনুযায়ী এই অভিযানটি বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরীক্ষা করবে এবং নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালন করবে। চাকাযুক্ত রােভার চন্দ্রপৃষ্ঠে চলাফেরা করবে। রােভার সমস্ত তথ্য চাদের কক্ষপথে থাকা চন্দ্রযান-২-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠাবে, যা একই উৎক্ষেপনে পিকব্যাক হয়ে যাবে। ১২ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে ইসরাে এবং রাশিয়ান ফেডারেল স্পেস এজেন্সি এই দুই মহাকাশ গবেষণা সংস্থা চন্দ্রযান-২ প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করার জন্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ৭ই সেপ্টেম্বর চন্দ্রযান-২ চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করবে। ইতিমধ্যে পৃথিবী ছেড়ে তা চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করেছে।

উদ্দেশ্য :

চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ইসরাের নজর দেওয়ার কারণ হল—(১) চাদের গর্তগুলিতে কয়েকশাে কোটি বছর ধরে সূর্যের আলাে পড়েনি, তাই সৌরজগতের সৃষ্টির নানা তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা। (২) গর্তগুলি সবসময় ছায়ায় থাকায় সেখানে ১০০ মিলিয়ন টন জল থাকার সম্ভাবনা। (৩) থাকতে পারে হাইড্রোজেন, অ্যামােনিয়া, মিথেন, সােডিয়াম, মার্কারি, সিলভারের বিশাল ভাণ্ডার। (৪) চাঁদের মাটিকে ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের ঘাঁটি করা।

প্রেক্ষাপট :

চন্দ্রযান-২ এর পােশাকী নাম দেওয়া হয়েছে বাহুবলী। ২২ জুলাই-র আগে ১৫ জুলাই উৎক্ষেপনের কথা ছিল চন্দ্রযানের। উৎক্ষেপনের ঠিক ৫৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড আগে যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে রকেটে। রকেটের একটি ভাল্ব থেকে নির্গত হচ্ছিল হিলিয়াম গ্যাস। ঝুঁকি নিতে চাননি বিজ্ঞানীরা। তাই উৎক্ষেপণ সফল হওয়ার ফলে একদিকে যেমন ভারতীয় স্পেস রিসার্চ প্রােগ্রাম কয়েক কদম এগিয়ে গেল, ঠিক তেমনই ভারত বিশ্বের অনেক দেশকে পিছনে ফেলে দিল স্পেস রিসার্চের ক্ষেত্রে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীনের পর চতুর্থ দেশ হিসেবে ভারত সাফল্য পেল মুন রােভার্স চাঁদের মাটিতে নামিয়ে।

প্রযুক্তিগত দিক :

হিংস্র জন্তু-জানােয়ারের পরােয়া না করে হিরের খোঁজে আফ্রিকার চাদের পাহাড়ে গিয়েছিলেন বিভূতিভূষণের শঙ্কর, আর সােনায় মুড়ে প্রায় চার লক্ষ কিমি. দূরে যাচ্ছে ভারতের চন্দ্রযান-২। এই সােনা আসলে পলিমাইড ও অ্যালুমিনিয়ামের একটি মিশ্র ধাতু যার সামনের দিকটায় রয়েছে পলিমাইড পদার্থ ও পেছনের দিকে রয়েছে অ্যালুমিনিয়াম। বিক্রম’ ও ‘প্রজ্ঞানকে সচল রাখতে সূর্যের বিকিরণ থেকে রক্ষা করতে এই ব্যবস্থা। না হলে মহাজাগতিক রশ্মির ঝড়-ঝাপটায় গরম হয়ে যন্ত্রগুলি বিকল হয়ে পড়বে।

গতিপথ :

ইসরাের চেয়ারম্যান বলেছেন, ধীরে ধীরে কৌণিক অবস্থানকে ৯০ ডিগ্রিতে নিয়ে যাওয়া হবে। তার জন্য চাঁদকে প্রদক্ষিণের জন্য চন্দ্রযান-২-কে পাঁচটি কক্ষপথে ঘােরাতে হবে। চাঁদকে প্রদক্ষিণের প্রথম তিনটি কক্ষপথের চেহারা হবে উপবৃত্তাকার, ডিমের মতাে। শেষের দুটি কক্ষপথ হবে বৃত্তাকার। ২রা সেপ্টেম্বর চন্দ্রযান-২ থেকে চাঁদের কক্ষপথই আলাদা হয়ে যাবে ল্যান্ডার বিক্রম।

সম্ভাবনা :

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পৃথিবীতে শক্তির চাহিদা মেটাবে চাঁদ, শক্তির প্রয়ােজন মেটাতে কয়লা বা প্রাকৃতিক গ্যাস লাগবে না। পৃথিবীর উয়ায়নের বিপদ থেকে রক্ষা করবে চাদের শক্তি। আগামী ৩০ বছরের মধ্যেই চাঁদ পৃথিবীর যাবতীয় শক্তির চাহিদা মেটাতে পারবে। কেননা পৃথিবীতে ৫ হাজার কিগ্রা. ওজনের কয়লা পােড়ালে যতটা শক্তি উৎপাদন হয়, চাদের মাত্র ৪০ গ্রাম হিলিয়াম-৩ মৌল থেকে তৈরি হবে ততটা শক্তি। পৃথিবীর পুরু বায়ুমণ্ডলে বাধা পেয়ে সূর্যের হিলিয়াম-৩ মৌলটি আর পাওয়া যায় না। চাঁদে বায়ুমণ্ডল না থাকায় সূর্য থেকে আসা হিলিয়াম-৩ মৌল অবিকৃতই থেকে যায়। চাদে আমেরিকা যতগুলি ‘অ্যাপােলাে’ মিশন পাঠিয়েছে, তাদের সকলেরই লক্ষ্য ছিল, আমাদের উপগ্রহে ওই তেজস্ক্রিয় মৌলগুলির সন্ধান ও সেগুলি কী পরিমাণে রয়েছে তার খােজখবর করা। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, গামা রে-সহ নানা রকমের বিষাক্ত বিকিরণের হাত থেকে বাঁচতে চাঁদের পিঠ থেকে দেড় মিটার গভীরে কলােনি বানানাে হবে। যার দ্বারা সৌরশক্তি টানার জন্য সােলার সেলগুলি বসানাে থাকবে। চাদে বানানাে যাবে বাড়ি যেখানে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস নেই।

উপসংহার :

কল্প বিজ্ঞানের গল্পে চাদের বাসিন্দাদের খুব একটা উল্লেখ নেই। চাদ—যাকে খালি চোখে দেখা যায় ছাদ থেকে, ওটা যে প্রাণহীন, তা প্রমাণিত হবে মিথ্যা বলে। যদিও বিক্রম শেষমুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তবুও ইসরাের বিজ্ঞানীরা মনে করছেন ৯০-৯৫ শতাংশ সাফল্য এসেছে। চাঁদ সদাগর বাণিজ্যে গিয়েছিলেন অর্থের সন্ধানে আর চন্দ্রযান-২ যন্ত্র হলেও নতুন জগতের শক্তিসন্ধানী নাবিক একালের চাঁদ সদাগর।


close