করােনাকালে অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি ও তার ভবিষ্যৎ

করােনাকালে অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি ও তার ভবিষ্যৎ

ভূমিকা :

বিশ্বায়ন উত্তরকালে যেমন পৃথিবীর অর্থনীতিতে ও সমাজে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল তেমনি করােনা-র সময়ে এবং তারও পরে মানুষের জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় আমূল বদল এসেছে।

স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় ব্যাপকভাবে অনলাইন পদ্ধতিতে শিক্ষার আয়ােজন হয়েছে—যার ফলে এর সুফল ও কুফল দুই-ই দেখা দিয়েছে।

আমাদের মতাে উন্নয়নশীল দেশে যেখানে এখনাে অনেকে দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করে, যেখানে শিক্ষার পরিকাঠামাে এখনাে সকলের শিক্ষার দ্বার উন্মােচন করতে পারেনি, সেখানে এই অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি সৃষ্টি করেছে বৈষম্য।

প্রাসঙ্গিকতা :

করােনা সতর্কতায় লকডাউন-এর জেরে স্কুল কলেজে সরকারিভাবে তালা পড়েছে, পড়াশােনা তাই শুরু হয়েছে অনলাইন পদ্ধতিতে। শুধু পড়াশােনা নয়—নাচ, গান, প্রাইভেট টিউশনের ভবিষ্যৎও অনলাইনে আটকে পড়েছে।

দ্য বেঙ্গল চেম্বার আয়ােজিত একটি অনলাইন কনক্লেভে উপস্থিত দেশবিদেশের শিক্ষা জগতের বিশেষজ্ঞরা অনলাইন ক্লাসের পদ্ধতির প্রশংসা করেছেন। তবে এই পরিকল্পনা রূপায়ণের বা বাস্তবায়নের জন্য উন্নত যােগাযােগ ব্যবস্থা প্রয়ােজন।

আবার এই প্রশ্নও উঠেছে শহরে থেকেও কিম্বা ওয়াই-ফাই সিস্টেমের মধ্যে থেকেও অনেক সময় কল ড্রপ বা ধীরগতির পরিষেবায় যেখানে সবাই তিতিবিরক্ত সেখানে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায় অনলাইন ক্লাস কী কষ্ট কল্পনা নয়?

অনলাইন পদ্ধতি কী :

করােনার সময় যখন দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রতিষ্ঠানে যেতে সক্ষম হচ্ছে। না, স্বাস্থ্যের কারণে সরকারও স্কুল কলেজ বন্ধ রেখেছে, সেখানে অনলাইন পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের কাজ করা ছাড়া আর কোনাে গত্যন্তর নেই।

এমনকি ডিজিট্যাল ইন্ডিয়াতে সবকিছুই যেখানে অনলাইন পরিষেবায় সুলভ হচ্ছে, সেখানে অনলাইন পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের অসুবিধা থাকার কথা নয়। শিক্ষক/ শিক্ষিকারা সরাসরি গুগল মিট বা কনফারেন্স কল-এর মাধ্যমে তাদের লেকচার পৌঁছে দিচ্ছেন।

এমনকি ভিডিওর মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে আপলােড করা হচ্ছে। বিভিন্ন শিক্ষার উপকরণ (Study material) ওয়েবসাইটে ভরে দেওয়া

হচ্ছে—যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়ােজনীয় বিষয় পেয়ে যেতে পারে। তৈরি হচ্ছে ভার্চুয়্যা ল্যাব ও ক্লাস। নির্দিষ্ট লেকচার, মডিউল ও অ্যাসাইনমেন্ট-এর সঠিক হদিশ পাওয়ার জন্য পাের্টাল ব্যবহারের জন্য শিক্ষার্থীদের কোর্সের নাম, শাখার নাম, সেমেস্টার নম্বর ও বিষয়ের কোড পূরণ করে পাঠাতে পারছে।

পাের্টালের ইউটিলিটি ও টুল বিভাগে ছাত্রছাত্রীরা আগে থেকে ইনস্টল করা বিভিন্ন কোড ব্যবহার করে তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে পারছে।

শিক্ষায় বৈষম্য :

ভারতের মতাে উন্নয়নশীল দেশে এই নতুন ধরনের অনলাইন ক্লাস যে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য আনবে সে বিষয়ে মন্তব্য করেছেন নােবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ এথার দুফলাের। তাঁর মতে কোভিড-১৯ উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সুনামি এনেছে।

ভারতে স্কুল বন্ধ থাকায় প্রায় ৩২ কোটি ছাত্রছাত্রী আপাতত গৃহবন্দী, এ নিয়ে সরকারের দীর্ঘস্থায়ী কোনাে পরিকল্পনাও নেই। ভারতে মাত্র ২৮ শতাংশ পরিবারের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছেছে, গ্রামীণ এলাকায় তা মাত্র ১৫ শতাংশ-র মতাে। তাই অনলাইনের সুবিধা পাবে মূলত উচ্চবিত্ত ও বেসরকারি স্কুলের পড়ুয়ারা।

অনলাইন ক্লাসের অসুবিধা :

বর্তমানে তাে আবার জাতীয় শিক্ষানীতি ঘােষিত হয়েছে, সেখানে অনলাইন ক্লাসের জন্য পরিকাঠামাে উন্নয়নের কোনাে প্রস্তাব আপাতত নেই। এই শ্রেণির ক্লাস-এর ক্ষেত্রে যে অসুবিধাগুলি সৃষ্টি হবে তা হল :

(১) শিক্ষায় ধনীরা বা উচ্চবিত্তরা লাভবান হবে, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে শিক্ষাব্যবস্থা। কারণ ভারতের মতাে উন্নয়নশীল দেশে যেখানে বি. পি. এল.-এর সংখ্যা যথেষ্ট, যেখানে করােনার পর বহু শ্রমিক, কর্মচারি বেকার সেখানে তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা কীভাবে এই খরচ সাপেক্ষ শিক্ষা পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত হবে।

(২) এর ফলে শিক্ষায় dropout বাড়বে—শিক্ষা ব্যবস্থা আর সাধারণের নাগালে থাকবে না। শিশু শ্রমিক ও বেকারত্বকে বাড়িয়ে দেবে।

(৩) ইতিমধ্যে বহু ছাত্রছাত্রী পেটের ভাত যােগাড়ের জন্য সবজির পসরা নিয়ে ফেরি করতে বেরিয়ে পড়েছে।

(৪) যাদের স্মার্ট ফোন নেই, যেখানে ইন্টারনেট পরিষেবাও দুর্লভ সেখানে গ্রামীণ এলাকার মানুষরা তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশােনার ক্ষেত্র থেকে ছাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করবেন না।

(৫) অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় সরাসরি শিক্ষক/ শিক্ষিকার সঙ্গে যেহেতু ছাত্রছাত্রীদের ভাব বিনিময় হচ্ছে না, তা অনেকাংশে কৃত্রিম হয়ে পড়ছে। ফলে প্রত্যেকদিনের পড়াশােনার কাজে আসছে। শৈথিল্য।

(৬) বিশেষ করে অনলাইন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষা গ্রহণ-পদ্ধতি open access অথবা টুকে লিখে দেওয়ার ভাবনায় পর্যবসিত হওয়ায় বিশেষ গভীরে তাদের প্রবেশ না করলেও হচ্ছে।

(৭) শিক্ষার বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় নমুনা সমীক্ষা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে সাক্ষরতার হার ৮০.৫ শতাংশ-এ পৌঁছেছে। কিন্তু রাজ্যের মাত্র ৯.৪ শতাংশ পরিবারের হাতে কম্পিউটার রয়েছে, মাত্র ১৬.৫ শতাংশ পরিবারের কাছে ইন্টারনেটের সুবিধা রয়েছে। এমনকি বিদ্যুতের ঘাটতিও রয়েছে, তাই অনলাইন পদ্ধতি সকলের কাছে পৌঁছে যাবে না।

(৮) সরকারি পরিষেবা বি. এস. এন. এল শেষ হয়ে গেছে প্রায়, সেখানে সরকারিভাবে ইন্টারনেট শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেবার ক্ষমতা আর সরকারের সামর্থ্যের মধ্যে নেই, তাহলে পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দুর্বল হলে ছাত্রছাত্রীরা আবার শিক্ষাক্ষেত্রে পরাধীন হবে।

উপসংহার :

লকডাউন-এর পর থেকে পড়াশােনায় অনলাইন পদ্ধতি বা ডিজিট্যাল মাধ্যম ক্রমাগত অপরিহার্য হলেও সেই মাধ্যম যদি সবার কাছে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা না থাকে তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে যে বৈষম্য সৃষ্টি হবে, সেই সম্ভাবনা থেকে মুক্ত হবার জন্য সরকারি পরিকাঠামাের অপ্রতুলতা মানুষকে দিশেহারা করে তুলবে।

জানি অনলাইন ক্লাসের সম্ভাবনা অপার তবে তা পাশ্চাত্যের ধনী দেশগুলিতে। আমাদের মতাে উন্নয়নশীল দেশে অনলাইন শিক্ষাপদ্ধতিকে আপামর ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দিতে হলে চাই সর্বাগ্রে পরিকাঠামাের উন্নয়ন, নতুবা তা পর্বতের মুযিক প্রসবের ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেবে।


RECENT POST

LATEST POST