উনিশ শতকের বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাম্মসমাজগুলির কীরূপ ভূমিকা ছিল ?


উনিশ শতকের বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ব্রাম্মসমাজগুলির কীরূপ ভূমিকা ছিল ?

উত্তর : ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামমােহন রায় তাঁর একেশ্বরবাদী ধর্মমত প্রচারের উদ্দেশ্যে যে ব্রাত্মসভা গড়ে তােলেন, পরবর্তীকালে তা একাধিক শাখা-উপশাখায় বিভক্ত হয়ে গেলেও বাস্তবিক পক্ষে এগুলির সবই ছিল বৃহত্তর ব্রাহ্র আন্দোলনের শরিক এবং মানব হিতৈষণার ব্রতে ব্ৰতী। ভারতীয় জনজীবনে ব্রাত্ম আন্দোলনের অবদান অনস্বীকার্য।

ব্রাত্ম আন্দোলনের অবদান

(i) কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠন : কুসংস্কারে নিগড়ে আবদ্ধ রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের বুকে ব্রাত্ম সমাজই প্রথম সজোরে আঘাত হানে। ব্রাত্ম ধর্মের একেশ্বরবাদ ও সমন্বয়বাদ পরবর্তীকালে হিন্দুধর্মের নবজাগরণে সাহায্য করেছিল।

(ii) নারী সমাজের উন্নয়ন ও স্ত্রীশিক্ষা : স্বাধীনতার প্রসারের ক্ষেত্রে ব্রায় সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্রের প্রেরণায় বয়স্কা মহিলাদের নিজ নিজ গৃহে শিক্ষাদানের জন্য ব্রাষ্মিকাগণ নিযুক্ত হন। এছাড়াও ব্রাত্ম সমাজ থেকে ব্রায় বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। পিতার সম্পত্তিতে কন্যার আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্রাহ্ সমাজের উদ্যোগ অনস্বীকার্য।

(iii) তিন আইন পাশ : ব্ৰায় সমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের তীব্রতায়, ব্রিটিশ সরকার ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে তিন আইন পাশ করতে বাধ্য হয়। এই আইন বলে, বাল্য- বিবাহ ও পুরুষের বহুবিবাহরদ করা হয় এবং বিধবাবিবাহ ও অসবর্ণ বিবাহ আইনসিদ্ধ হয়।

(iv) নিম্নবর্গের সামাজিক উন্নয়ন : সমাজের প্রান্তিক জনসাধারণের উন্নয়নের জন্য ব্রাম্মসমাজ উদ্যোগী হয়। অন্ত্যজ শ্রেণির উন্নয়নের পাশাপাশি পাটকল শ্রমিকদের জন্য নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন, মদ্যপান-বিরােধী প্রচার ইত্যাদি কর্মসূচির রূপায়ণ

করে ব্রাম্মসমাজ।

(v)জাতীয়তাবাদের জাগরণ : জাতীয়তাবাদের জাগরণে ব্রাম্মসমাজ,বিশেষত, কেশবচন্দ্র সেনের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। কেশবচন্দ্রের সর্বভারতীয় ভ্রমণ ও প্রচারকার্য শিক্ষিত ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের জাগরণে কার্যকরী ভূমিকা নেয়। 

অন্যান্য অবদান

(i) ব্রাম্মসমাজ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠ বিষয়গুলির সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে দেখােন্নয়নে ব্রতী হয়।

(ii) আর্ত-পীড়িতের সেবাকার্যেও ব্রাত্মসমাজ পিছিয়ে ছিল না।

(iii) এই প্রতিষ্ঠানই ভারতকে বহু জাতীয়তাবাদী নেতা তথা ধর্ম ও সমাজ-সংস্কারক উপহার দিয়েছে।

মূল্যায়ন : অনেকে ব্রাম্মসমাজী আন্দোলনকে ‘এলিটিস্ট’ এবং জাতীয় জীবনের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন’ বলে সমালােচনা করলেও উনিশ শতকীয় বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণে ব্রাহ্র আন্দোলনের অবদান কোনােমতেই অস্বীকার করা যায় না।



error: Content is protected !!